দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে এক মাসের ব্যবধানে ডালজাতীয় পণ্যের দাম কমেছে | ছবি: ফাইল/নিজস্ব আলোকচিত্রী
রমজানকে ঘিরে সাধারণত দেশে ভোগ্যপণ্যের বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এ সময়ে চালের চাহিদা কিছুটা কমলেও ডাল, ভোজ্যতেল, খেজুর, পেঁয়াজসহ ইফতার ও সাহরির পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
রমজানকে ঘিরে সাধারণত দেশে ভোগ্যপণ্যের বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এ সময়ে চালের চাহিদা কিছুটা কমলেও ডাল, ভোজ্যতেল, খেজুর, পেঁয়াজসহ ইফতার ও সাহরির পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রমজান শুরুর এক-দুই মাস আগেই এসব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। তবে এবার বাজার পরিস্থিতি তুলনামূলক ভিন্ন। পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ধরনের ডাল ও খেজুরের দাম গত এক মাসে পাইকারি বাজারে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে খুচরা বাজারেও। বাজারসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে রমজান মাসজুড়েই ডাল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই থাকবে।
দেশের প্রধান ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ঘুরে দেখা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের ডালজাতীয় পণ্যের দাম নিম্নমুখী। বিশেষ করে ছোলার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ৬৮ টাকায় নেমে এসেছে। অথচ ২০২৫ সালজুড়ে পণ্যটি পাইকারি বাজারে বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১১০-১২০ টাকায়। ছোলার পাশাপাশি মসুর ডাল, মুগডাল, অ্যাংকর ডাল, পেলন, খেসারি ও মাষকলাই ডালের দামও কমেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় এবার রমজানের আগে বাজার অনেকটাই স্বাভাবিক।
ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যে দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা মোটা আকারের মসুর ডাল গতকাল পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ৭০-৭২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কয়েক মাস আগেও তা ১০০-১০২ টাকায় লেনদেন হয়। দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এ ডালের দাম গত এক মাসে সবচেয়ে বেশি কমেছে। তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ভারতীয় মসুর ডালের ক্ষেত্রে। ভারত থেকে আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি পাওয়ায় এ ডালের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৪০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১৬০ থেকে ১৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মুগডালের বাজারেও দাম কমার প্রবণতা স্পষ্ট। ছোট আকারের এ ডালের দাম কেজিপ্রতি ২০-২৫ টাকা কমে বর্তমানে ১৩৫-১৪০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। মাঝারি আকারের মুগডাল একই পরিমাণ কমে কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৯৫-১০০ টাকায়। মৌসুমের শেষভাগে দেশীয় মুগডালের সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদা বেড়েছে আমদানীকৃত ডালের। তবে পর্যাপ্ত আমদানি ও বিশ্ববাজারে দাম কমে যাওয়ায় মুগডালের বাজার স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি অ্যাংকর ডাল ৪২-৪৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্তও ডালটির দাম কেজিপ্রতি ৬০ টাকার ওপরে ছিল। রোজায় সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন খেসারি ডালের দামও কমেছে। বর্তমানে এটি কেজিপ্রতি ৬৮-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগেও ছিল ৭৫-৮০ টাকা। পাশাপাশি পেলন ডালের দাম কেজিপ্রতি ১৫-২০ টাকা কমে বর্তমানে প্রায় ৭০ টাকায় নেমেছে। আস্ত পেলনের দাম কমে কেজিপ্রতি ৪৫-৫০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। এছাড়া পাইকারি বাজারে এক মাসের ব্যবধানে মাষকলাই ডালের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা কমেছে। গতকালের পাইকারি বাজারে ডালটি কেজিপ্রতি ১১০-১১২ টাকায় বিক্রি হয়।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চলতি বছর বিশ্ববাজারে ডালজাতীয় পণ্যের বুকিং মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে মসুর, অ্যাংকর ও ছোলার দাম হ্রাস পেয়েছে টনপ্রতি ১৫০-২০০ ডলার পর্যন্ত। এর ফলে আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডাল আমদানি করা সম্ভব হয়েছে। তবে আমদানি বাড়লেও শীত মৌসুমে সবজি এবং পোলট্রিজাতীয় খাদ্যপণ্য—বিশেষ করে মুরগি ও ডিম কম দামে পাওয়া যাওয়ায় ডালের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম। পাশাপাশি রমজান উপলক্ষে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি আরো বাড়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, যা দাম কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মেসার্স হক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আজিজুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ডালজাতীয় পণ্যের বাজার আর একক কোনো বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল নয়। আগে মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সর্বাধিক আমদানি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করত। তবে এক-দেড় বছর ধরে বড় সেই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। ফলে এখন ছোট ও মাঝারি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে আমদানি হওয়ায় পাইকারি বাজারে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মসুর ডাল, ছোলা ও অ্যাংকর ডালের ক্ষেত্রে একক আধিপত্য কমে যাওয়ায় দামও স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে।’
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়েও মসুর, ছোলা ও অ্যাংকর ডালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল উল্লেখ করে এ ব্যবসায়ী আরো বলেন, ‘ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলেছে। গত এক মাসে ডালজাতীয় প্রায় সব পণ্যের দাম কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৫০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। ফলে আসন্ন রমজানে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন ছোলা, মসুর ও অ্যাংকর ডালের বাজার সহনীয় পর্যায়ে থাকবে বলে আশা করছি। এছাড়া আসন্ন রমজান শীত মৌসুমে শুরু হওয়ায় সবজির সরবরাহ তুলনামূলক বেশি থাকবে। এর প্রভাবেও রোজাকেন্দ্রিক ভোগ্যপণ্যের বাজার সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে।’
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রতিবেদনেও ডালের দামে নিম্নমুখী প্রবণতার বিষয়টি উঠে এসেছে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ছোলার দাম ছিল ১০৮-১১০ টাকা, আমদানীকৃত মোটা মসুর ডাল ৯৫-৯৭, মুগডাল ১৫০-১৫৫, অ্যাংকর ডাল ৫৫-৫৮ ও খেসারি ডাল ১০২-১০৪ টাকা। বর্তমানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশের পাইকারি বাজারগুলোয় সব ধরনের ডালের দাম এসব স্তর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ আরো বাড়লে ডালের বাজার আরো কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান সময়ে দেশে শুধু ভারত থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। দেশের স্থলবন্দরগুলো দিয়ে আমদানীকৃত পণ্যের শুল্ক ৫ শতাংশ হারে বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। বিশেষ করে শুকনো খাদ্য, মসলাজাতীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। তবে খেঁজুরসহ রমজানের অধিকাংশ পণ্যই ভারতনির্ভর না হওয়ায় দেশের ভোগ্যপণ্য বাজার আগের তুলনায় স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। শুল্ক কম থাকায় আমদানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আসন্ন রমজানে খেঁজুরের দাম অনেকটাই কমে যেতে পারে। একইভাবে ভোজ্যতেলের দাম সরকারিভাবে বৃদ্ধির পর সহনীয় পর্যায়ে লেনদেন হচ্ছে পাইকারি বাজারে। বিশ্ববাজারে সয়াবিন ও পাম অয়েলের বুকিং দর নিম্নমুখী থাকায় আসন্ন রমজানের আগে সরকার চাইলে পণ্যটির দাম কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশে ভোক্তার স্বার্থ, ন্যায্যমূল্য এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে ডালসহ রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের দাম নিম্নমুখী হওয়া নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। তবে প্রতি বছর রমজানের কয়েক সপ্তাহ আগে সরবরাহ কমিয়ে ও মজুদ বাড়িয়ে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এ প্রবণতা প্রতিরোধে সরকারকে আগেভাগেই সজাগ থাকতে হবে।’
তিনি জানান, ক্যাবের পক্ষ থেকে রমজানসহ বিভিন্ন সময়ে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মজুদ পরিস্থিতি তদারক, অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা এবং পণ্যমূল্য সহনীয় রাখতে সরকারের বহুমুখী কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানানো হয়েছে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং পণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি। এজন্য সরকারি তদারককারী সংস্থাগুলোয় প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন এসএম নাজের হোসাইন।





