বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির জায়গা খুব কম। এই ভূখণ্ডে আমাদের একমাত্র রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিচয়- আমরা বাংলাদেশী। এর বাইরে কোনো সমান্তরাল জাতিসত্তা, আলাদা রাষ্ট্রচেতনা কিংবা বিশেষ শ্রেণিভিত্তিক পরিচয় টিকিয়ে রাখার সুযোগ নেই। ইতিহাস, সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা- তিনটিই এই সত্যকে সমর্থন করে।
পাহাড়ি অঞ্চলের প্রশ্নে এই বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিকল্পিত বয়ান তৈরি করা হয়েছে- ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের দাবি, ভূমির একচ্ছত্র মালিকানা এবং সেই সূত্রে আলাদা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দাবিগুলো কি সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য, নাকি এগুলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক সমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
রাষ্ট্র গঠনের দর্শনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খুব পরিষ্কার অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ কোনো আবেগী স্লোগান ছিল না- এটি ছিল বহুত্বের ভেতরে ঐক্য, সমতার ভেতরে সংহতি এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন এক রাষ্ট্রচিন্তা। এই দর্শনের কারণেই পাহাড় আজও বাংলাদেশের অখণ্ড মানচিত্রের অংশ। বিচ্ছিন্নতাবাদী অপতৎপরতা বারবার মাথাচাড়া দিলেও রাষ্ট্র ভাঙেনি। কারণ রাষ্ট্র নিজেকে সংজ্ঞায়িত করেছে নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তিতে, নৃগোষ্ঠী বা গোত্রের ভিত্তিতে নয়।
আজ পাহাড়ে ‘ভূমি সমস্যা’ শব্দটি বারবার শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে এই দাবির আড়ালে অনেক সময় একটি বিপজ্জনক বক্তব্য লুকিয়ে থাকে- এই ভূমি কেবল তাদের, এখানে অন্য বাংলাদেশীদের থাকার অধিকার নেই। এই যুক্তি যদি মেনে নেওয়া হয়, তবে সংবিধানের সমতার নীতিই ভেঙে পড়ে। সমতলে যেমন বাঙালি ও পাহাড়ি উভয়েই থাকে, পাহাড়েও তেমনই সকল বাংলাদেশীর সমান অধিকার থাকতে হবে।
আরেকটি কঠিন বাস্তবতা হলো- পাহাড়ি অঞ্চলে আইনের শাসন একরকম, সমতলে আরেকরকম। কোথাও কোথাও একই অপরাধে ভিন্ন শাস্তি, ভিন্ন বিচারপ্রক্রিয়া চলে। এটি কি বৈষম্য নয়? এটি কি মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়? পাহাড়ে বসবাসকারী সাধারণ উপজাতিরাও এই ব্যবস্থার শিকার। ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর চাঁদাবাজি, দমন-পীড়ন এবং অনানুষ্ঠানিক ‘বিচার’-এর কারণে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
এই বাস্তবতাগুলো নিয়ে একটি নিরবতা আছে। শহুরে সুশীল সমাজ, মানবাধিকার নিয়ে সরব গোষ্ঠী পাহাড়ের এই বৈষম্য নিয়ে খুব কমই কথা বলে। অথচ বৈষম্য যদি দূর করতেই হয়, তবে তা হতে হবে সর্বত্র, সবার জন্য, একই আইনের মাধ্যমে।
সমাধান কোনো বিশেষ পরিচয়কে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া নয়। সমাধান হলো সমতল ও পাহাড়ের বৈষম্য দূর করা, এক আইন, এক বিচার, এক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে বসবাসের শর্ত একটাই- এই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব মানতে হবে, ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়কে গ্রহণ করতে হবে।
এই ভূখণ্ডে কেউ অতিথি নয়, আবার কেউ বিশেষ অধিকারভোগীও নয়। আমরা সবাই বাংলাদেশী। এর বাইরে কোনো পরিচয় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে পারে না। এখানেই ফুলস্টপ।





