অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ড. আমিনুল করিম বলেছেন, বাঙালি জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনোভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব হতো না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালিদের টিকে থাকাও সম্ভব ছিল না। ফলে দেশ রক্ষায় সেনাবাহিনী ও বাঙালি জনগোষ্ঠী—উভয়ের অবদান অনস্বীকার্য।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর রাওয়া ক্লাবে আয়োজিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারটির আয়োজন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদ।
ড. আমিনুল করিম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক। এসব সমস্যা সমাধানে পাহাড়ি ও বাঙালি—সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্য সংখ্যা বাড়ানো জরুরি, কারণ এককভাবে সেনাবাহিনীর পক্ষে সব দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন কিছু এনজিও সক্রিয় রয়েছে যারা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত। এসব সংগঠনের কার্যক্রম বয়কট ও প্রয়োজনে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান তিনি।
নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ড. আমিনুল করিম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনের সময় স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কাছ থেকেও তিনি সহযোগিতা পেয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে কিছু দুষ্কৃতকারী গোষ্ঠীই পরিকল্পিতভাবে ওই অঞ্চলকে অশান্ত করার চেষ্টা করে। তাই দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মো. মজিবর রহমান। সভাপতির বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি দাবি করেন, একটি খ্রিষ্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো পরোক্ষভাবে কাজ করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের আনাগোনা বেড়েছে, যা উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদার করার দাবি জানান।
প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া পার্বত্য অঞ্চলে কৃত্রিম লেক নির্মাণের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন বিকাশে কাপ্তাই লেককে নিরাপদ ও পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মো. মোস্তফা আল ইহযায। স্বাগত বক্তব্য দেন অধ্যক্ষ আবু তাহের। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) সরওয়ার হোসাইন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজালাল, কর্নেল শাহাদাত হোসেন, কর্নেল (অব.) এস কে আকরাম, কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমানসহ সামরিক ও বেসামরিক পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মো. মোস্তফা আল ইহযায বলেন, সম্প্রতি ফুরমোন পাহাড় এলাকায় ভ্রমণে আসা পর্যটকরা ইউপিডিএফের অস্ত্রধারী সদস্যদের দ্বারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তল্লাশির নামে মোবাইল ফোন ছিনতাই, চাঁদা দাবি এবং নারী পর্যটকদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগও করেন তিনি। এসব ঘটনায় পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানান তিনি।
বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেখানে বসবাসরত জনগণের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন, নিরাপদ পর্যটন এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেন তারা।





