রেসকোর্সের টেবিলে অনুপস্থিত ওসমানী, কিন্তু বিজয়ের নকশাকার তিনিই

Picture of নয়া বাংলা

নয়া বাংলা

১০৫
১০৫

মোঃ আশিকুর রহমান

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবান্বিত দিন। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান আর ২ লাখ মা-বোনের আত্নদানের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের বিজয়। বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যখন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করছিলেন, তখন বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নিচ্ছিল আমাদের সোনার ‘বাংলাদেশ’।

সেই ঐতিহাসিক টেবিলে বিজয়ী পক্ষের হয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন যৌথ বাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও অনেক বাঙালির মনে একটি আক্ষেপ বা প্রশ্ন রয়ে গেছে “এই আত্মসমর্পণ তো জেনারেল ওসমানীর কাছেই করার কথা ছিল। কেন তিনি সেখানে ছিলেন না? বা কেন তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হলো না?”

সঠিক ইতিহাস জানতে হলে আমাদের আবেগের পাশাপাশি তৎকালীন ভূ-রাজনীতি, যুদ্ধকৌশল এবং আন্তর্জাতিক প্রটোকলকে বিশ্লেষণ করতে হবে।

যৌথ বাহিনী এবং কমান্ড কাঠামো

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, বিশেষ করে ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান যখন ভারতের ওপর বিমান হামলা চালায়, তখন যুদ্ধটি নতুন মোড় নেয়। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলেই গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনী’ এই যৌথ কমান্ডের নেতৃত্বে ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের জিওসি-ইন-সি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা।

মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে শেষে এসে যোগ দেয় ভারতীয় সেনাবাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে। জেনারেল ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান বা মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। কিন্তু যখন ‘যৌথ কমান্ড’ গঠিত হয়, তখন সামরিক প্রটোকল ও জ্যেষ্ঠতার ক্রম অনুযায়ী এবং লজিস্টিক সাপোর্টের বিশালত্বের কারণে কমান্ডের নেতৃত্ব জেনারেল অরোরার হাতে ন্যস্ত হয়। তবে এটি ছিল পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে।

১৬ ডিসেম্বরের বিকেল,রেসকোর্সের দৃশ্যপট

১৬ ডিসেম্বর সকালে জেনারেল নিয়াজী যখন নিশ্চিত হন যে ঢাকার পতন আসন্ন এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য (মার্কিন সপ্তম নৌবহর) আসার কোনো সম্ভাবনা নেই, তখন তিনি যুদ্ধবিরতি ও আত্মসমর্পণে রাজি হন।

বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে হাজারো জনতার ঢল। একটি সাধারণ কাঠের টেবিলে বসে দলিলে স্বাক্ষর করা হয়। পাকিস্তানের পক্ষে জেনারেল নিয়াজী এবং যৌথ বাহিনীর পক্ষে জেনারেল অরোরা সই করেন। এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-সেনাপ্রধান ও একে খন্দকার (পরবর্তীতে এয়ার ভাইস মার্শাল)। তিনি জেনারেল ওসমানীর নির্দেশেই সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

জেনারেল ওসমানী কেন উপস্থিত ছিলেন না?

এটিই সেই বহুল আলোচিত প্রশ্ন। জেনারেল ওসমানীর অনুপস্থিতির পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করে থাকেন।

১. প্রটোকল বা সামরিক রীতি।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে সাধারণত বিজয়ী বাহিনীর ফিল্ড কমান্ডার বা থিয়েটার কমান্ডার উপস্থিত থাকেন। যেহেতু যুদ্ধের শেষ ধাপে ‘যৌথ বাহিনী’ যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল এবং জেনারেল অরোরা ছিলেন সেই যৌথ কমান্ডের প্রধান, তাই প্রটোকল অনুযায়ী তিনিই স্বাক্ষর করার অধিকারী ছিলেন। তবে, জেনারেল ওসমানী পদমর্যাদায় জেনারেল অরোরার সমকক্ষ ছিলেন। তাই হয়তো তিনি ‘যৌথ কমান্ডের’ অধীনস্থ হিসেবে উপস্থিত থাকতে চাননি-এমন মতও অনেকে পোষণ করেন। তবে এটি পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

২. অবস্থানগত ও যোগাযোগ সমস্যা।

সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য হলো, ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল ওসমানী অবস্থান করছিলেন সিলেটে। তিনি তার সদর দপ্তর বা রণক্ষেত্র পরিদর্শনে ছিলেন। ওই সময়ে সিলেট থেকে ঢাকা আসা খুব সহজ ছিল না। তার ব্যবহৃত হেলিকপ্টারটি আগের দিন শত্রুপক্ষের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলেও জানা যায়। জেনারেল অরোরা এবং তার দল কলকাতা থেকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আসেন, কিন্তু ওসমানীর পক্ষে সেই অল্প সময়ে সিলেটে থেকে ঢাকায় পৌঁছানো লজিস্টিকালি অসম্ভব ছিল।

৩. জেনেভা কনভেনশন ও পাকিস্তানের ভীতি।

এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি বিষয়ও ছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিল। কারণ, তারা জানত যে ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে ‘জেনেভা কনভেনশন’ অনুযায়ী তারা ‘যুদ্ধবন্দী’ হিসেবে গণ্য হবে এবং নিরাপত্তা পাবে। কিন্তু তারা যদি সরাসরি মুক্তি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করত, তবে তাদের প্রাণের ভয় ছিল। ৯ মাস ধরে তারা যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তার প্রতিশোধ নিতে উত্তেজিত জনতা বা মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ওপর চড়াও হতে পারে- এই ভীতি নিয়াজীর মধ্যে প্রবল ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীও চেয়েছিল প্রথাগত কোনো সেনাবাহিনীর কাছে অস্ত্র জমা দিতে।

আত্মসমর্পণ কি ওসমানীর কাছে হওয়া উচিত ছিল?

আবেগ এবং জাতীয়তাবাদের জায়গা থেকে উত্তর হলো-‘অবশ্যই’। এই যুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের মানুষের। রক্ত দিয়েছে বাঙালি। তাই বিজয়ের দলিলে স্বাক্ষরের মূল হকদার ছিলেন জেনারেল ওসমানী।

কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে উত্তরটি কিছুটা জটিল। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে তখনো ‘বাংলাদেশ’ স্বীকৃত রাষ্ট্র হিসেবে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি (ভুটান ও ভারত ছাড়া তখনো কেউ স্বীকৃতি দেয়নি)। পাকিস্তান বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে বা মুক্তি বাহিনীকে নিয়মিত সেনাবাহিনী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের দৃষ্টিতে মুক্তিযোদ্ধারা ছিল ‘বিদ্রোহী’।

যদি নিয়াজী জেনারেল ওসমানীর কাছে আত্মসমর্পণ করতেন, তবে পাকিস্তান পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আদালতে দাবি করতে পারত যে, তাদের সৈন্যরা ‘বিদ্রোহীদের’ হাতে বন্দী হয়েছে, যা জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন। ভারত ও বাংলাদেশ সরকার চেয়েছিল আইনি কোনো ফাঁকফোকর না রাখতে। তাই ভারতীয় জেনারেলের (যিনি একটি স্বীকৃত রাষ্ট্রের প্রতিনিধি) উপস্থিতিতে আত্মসমর্পণ করানোটা ছিল একটি কূটনৈতিক ও আইনি রক্ষাকবচ। এটি নিশ্চিত করেছিল যে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের বিচার বা প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমেই হবে।

তবে, দলিলে স্পষ্ট লেখা ছিল— জেনারেল অরোরা স্বাক্ষর করছেন অর্থাৎ, তিনি বাংলাদেশের নামেই স্বাক্ষর করেছিলেন।

ওসমানীর অবদান কি এতে ম্লান হয়?

কখনোই না। একটি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি দিয়ে জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর বিশালত্ব পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন এই যুদ্ধের প্রধান স্থপতি।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছিল সুশৃঙ্খল এবং ভারী অস্ত্রে সজ্জিত। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিককে নিয়ে একটি গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলা, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ‘তেলিয়াপাড়া রণকৌশল’ প্রণয়ন করে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা-এসবই ছিল ওসমানীর মস্তিষ্কের ফসল। তিনি যদি জেড ফোর্স, কে ফোর্স এবং এস ফোর্স গঠন করে প্রথাগত যুদ্ধের চাপ সৃষ্টি না করতেন এবং একইসাথে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানকে নাস্তানাবুদ না করতেন, তবে মিত্রবাহিনীর পক্ষে মাত্র ১৩ দিনে ঢাকা দখল করা সম্ভব হতো না।

জেনারেল অরোরা এসেছিলেন ফিনিশিং টাচ দিতে, কিন্তু যুদ্ধের জমিন তৈরি করেছিলেন জেনারেল ওসমানী। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় ছিল ওসমানীর দীর্ঘ ৯ মাসের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কৌশলের চূড়ান্ত ফসল।

১৬ ডিসেম্বরের সেই বিকেলে জেনারেল ওসমানী হয়তো রেসকোর্স ময়দানের সেই টেবিলে ছিলেন না, কিন্তু সেই টেবিলটি যে স্বাধীন দেশের মাটিতে পাতা হয়েছিল, তা তার নেতৃত্বেই মুক্ত হয়েছিল। জেনারেল নিয়াজীর নতজানু মস্তকটি ছিল ওসমানীর রণকৌশলের কাছে পরাজয়ের প্রতীক।

ইতিহাস আবেগের দ্বারা চালিত হয় না, ইতিহাস চলে বাস্তবতা ও যুক্তির পথে। জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পণের ঘটনাটি ছিল সেই সময়ের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতার অনিবার্য অংশ। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, সেই দলিলে স্বাক্ষর যারই থাক, সেই দলিলের পেছনের শক্তি ছিল বাংলাদেশের দামাল ছেলেরাই, আর তাদের সেনাপতি ছিলেন বঙ্গবীর ওসমানী। তাই ১৬ ডিসেম্বর মানেই জেনারেল ওসমানী, ১৬ ডিসেম্বর মানেই বাংলাদেশের বিজয়।

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

    About The Author

    নরসিংদীর বেলাবোতে মসজিদ-মাদ্রাসায় হামলা ও ভাঙচুর

    ৪৩ নরসিংদীর বেলাব উপজেলার দুলালকান্দি এলাকার বাঁশবাজার কাঁসার বাপেরবাড়ি জোড়া সুন্নতি জামে মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট মুহাম্মদীয়া জামিয়া শরীফ মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটিয়েছে

    Read More »

    নরসিংদীর বেলাবোতে মসজিদ-মাদ্রাসায় হামলা ও ভাঙচুর

    ৭ নরসিংদীর বেলাব উপজেলার দুলালকান্দি এলাকার বাঁশবাজার কাঁসার বাপেরবাড়ি জোড়া সুন্নতি জামে মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট মুহাম্মদীয়া জামিয়া শরীফ মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটিয়েছে

    Read More »

    ভোলাহাটের সুরানপুরে হিংস্র কুকুরের হামলা, একের পর এক ছাগল-ভেড়া নিহত

    ৭২ চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার সুরানপুর গ্রামে গত কিছুদিন ধরে হিংস্র কুকুরের আক্রমণে একের পর এক ছাগল ও ভেড়া মারা যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কুকুরের কামড়ে আরও

    Read More »

    নোবিপ্রবিতে বেওয়ারিশ কুকুরের হামলায় আহত দুই শিশু, বাড়ছে উদ্বেগ ও অনিরাপত্তা

    ৫৮ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) সংলগ্ন পকেট গেট এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের হামলায় প্রায় পাঁচ বছর বয়সী দুই শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। আহত শিশুদের

    Read More »

    ‘কওমি মাদরাসা যেন টর্চার সেল’, সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি

    ২৬ সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল একটি রিলে বাংলাদেশে কওমি মাদরাসাগুলোর শিশুদের ওপর নির্যাতনের একটি ভয়াবহ ভিডিওচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ৬ মিনিটের এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে,

    Read More »

    বাস-হাইসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ১০

    ৫৭ কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার কুদালিয়া এলাকায় বাস ও হাইস মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল আনুমানিক ১০টা

    Read More »

    Table of Contents