আধুনিক সমাজের নানা অসঙ্গতি, নাগরিক জীবনের অস্থিরতা এবং মানুষের না বলা কষ্টগুলোকে গল্পের ভেতর দিয়ে তুলে ধরেছে লেখক ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন এর নতুন বই প্রফেসরের প্রেসক্রিপশন। উচ্ছ্বাস প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি কেবল গল্পের সংকলন নয়, বরং সমসাময়িক বাস্তবতার নানা স্তরকে বিশ্লেষণ করা এক সাহসী সাহিত্যিক প্রয়াস। সহজ কিন্তু গভীর ভাষার মাধ্যমে লেখক আমাদের সমাজ, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা ও নাগরিক জীবনের সংকটকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।
বিশ্বের যুদ্ধ ও সংকট কি সত্যিই আমাদের থেকে দূরে থাকে নাকি ফিলিস্তিনের দীর্ঘযন্ত্রণার যুদ্ধ, বর্তমান ইরান‑ইসরাইল‑যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এবং আমাদের দেশের বাস্তবতা সবই একসাথে সময়ের গল্প। বইটিতে এই বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। লেখক দেখিয়েছেন কেন শিয়া ও সুন্নি মুসলিমসহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে? বর্তমানে মিডিয়ায় আলোচিত এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের সচেতনতা, ঐক্য এবং সমবেদনার প্রতিফলন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি আমাদের শেখায় যে, আন্তর্জাতিক ঘটনার প্রভাব আমাদের জীবন এবং সমাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, এবং বিশ্বের যেকোনো সংকটের প্রতিক্রিয়া আমাদেরকেও ভাবতে বাধ্য করে।
বইটির নামগল্প ‘প্রফেসরের প্রেসক্রিপশন’-এ উঠে এসেছে চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্ধকার দিক। এখানে দেখা যায় কীভাবে ওষুধ কোম্পানির বিপণন কৌশলের কাছে অনেক সময় জিম্মি হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। নাফিজ নামের এক সাধারণ মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন এই ব্যবস্থার অসহায় বাস্তবতা। একইভাবে ‘শিক্ষাক্ষেত্রে অঘোষিত শ্রেণিবিভাগ’ প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বৈষম্য। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা এবং এর ফলে তরুণ সমাজের মানসিক চাপে পড়ার বিষয়টি সেখানে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে
গ্রন্থটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর বিষয়বৈচিত্র্য। ‘প্রবাসের স্বপ্ন’ গল্পে বিদেশে পড়াশোনা বা কাজের আশায় ছুটে চলা তরুণদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং আইইএলটিএস সেন্টারের নামে প্রতারণার চিত্র ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে ‘ধোঁয়ার শহর’ ও ‘হারিয়ে যাওয়ার পথে’ গল্পগুলোতে নগর জীবনের পরিবেশগত সংকট, যানজট ও গ্যাস সংকটের মতো দৈনন্দিন দুর্ভোগকে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে। ফলে বইটি শুধু গল্পের বিনোদন দেয় না, বরং সমাজের বাস্তবতাকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
অন্ধকার বাস্তবতার পাশাপাশি বইটিতে মানবিকতার উজ্জ্বল দিকও উঠে এসেছে। ‘রক্তিম ভালোবাসা’ গল্পে রক্তদানের মতো ছোট মানবিক উদ্যোগ কীভাবে একটি জীবন বাঁচাতে পারে, সেই বার্তাটি হৃদয়স্পর্শীভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আবার ‘শেখরের স্মৃতি’ ও ‘সাগরে মেজবান’ গল্প পাঠককে নস্টালজিক আবহে নিয়ে যায়, যেখানে পারিবারিক সম্পর্ক, উৎসব এবং স্মৃতির আবেগ সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে।
বইটির ভাষা সহজবোধ্য হলেও ভাবনা অত্যন্ত গভীর ও প্রখর। কোনো কৃত্রিম অলংকারের আড়াল না রেখে লেখক সমাজের নানা সংকটকে সরাসরি তুলে ধরেছেন।
তাই জীবনমুখী গল্প এবং সমাজের বাস্তবতা নিয়ে যারা ভাবতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই বইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হতে পারে। সমসাময়িক সময়কে বুঝতে এবং চারপাশের বাস্তবতাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে ‘প্রফেসরের প্রেসক্রিপশন’ পাঠককে একটি শক্তিশালী সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা দেয়।
বইটি পাওয়া যাচ্ছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান–এ আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা–র উচ্ছ্বাস প্রকাশনী স্টল নম্বর ৬৩৮–এ।





