ইসলামি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ দিবস ‘নাই’র বয়ান তৈরি করে ও তার দিবসীয় চেতনার উপর অনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে মুসলিম জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। অতীতেও এর প্রমাণ মিলে। আমরা জানি, পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীরা কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপনিবেশ গড়েই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা মানসিক ও সাংস্কৃতিক উপনিবেশও প্রতিষ্ঠা করেছে। গ্রামশির ‘কালচারাল হেজিমনি’ তত্ত্ব অনুসারে, ক্ষমতাসীন শ্রেণি একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক কাঠামো চাপিয়ে দেয়, যাতে শাসিতগোষ্ঠী নিজেদের স্বকীয় সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে শাসকদের আদর্শকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য মনে করে। এতে ঐ জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করা শাসন করা শাসক গোষ্ঠীর মোড়ল শ্রেণীর জন্য অত্যন্ত সহজ হয়।
ইসলাম এখানে পিছিয়ে থাকে নাই। মদিনার দুইদিনের খেলার বদলে বিকল্প হিশেবে ঈদুল ফিরত ও ঈদুল আজহা নিয়ে আসেন। অর্থাৎ খেলার উৎসবকে শুধু হারাম করেই ছেড়ে দেন নাই, যাতে মানসিক দরিদ্রতা তৈরি না হয়, সে কারণে নতুন দুইটা দিন ঐখানে এনে হাজির করেছেন।
আসলে নজদী ওহাবীরা পশ্চিমা এজেন্ডার অংশ হিশেবে শবেবরাত নাই করে দিয়ে নতুন সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা যাচ্ছে। আপনি ভুলে গেলে চলবে না, এই পশ্চিমা আগ্রাসী তরীকায় নজদী ওহাবীরাও অংশীদার। তারা মুদ্রার ওপিঠট হয়ে কাজ করছে।
আপনাকে মনে রাখতে হবে, নজদী ওহাবী মতবাদে প্রভাবিতরা দিবস-পালন, ওলীদের সম্মান ও খানকাহ-মাজার সংস্কৃতি নির্মূলের নামে এক ধরনের সাংস্কৃতিক শূন্যতা সৃষ্টি করছে। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি মুসলিমদের জীবনে অনুপ্রবেশ করছে। যেমন, শবে বরাতকে ‘বেদআত’ আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করতে চায় তারা, অথচ হ্যালোউইন, থার্টি ফার্স্ট নাইট, ভ্যালেন্টাইন্স ডে-এর মতো বিজাতীয় সংস্কৃতি মুসলমানদের মধ্যে অবাধে প্রবেশ করছে। এর বিপক্ষে আমাদের দেশীয় মৌলভীদের ‘বিরোধিতা’ রাজনীতি থাকলেও বিকল্প হাজির করতে না পারায় বিরোধিতার প্রজেক্ট ফেইল করছে।
ওহাবীজমের এই ‘নাই’ বয়ানের খেলা নিছক আক্বিদাগত বিভ্রান্তি নয়—একটি সচেতন প্রকল্পও।
আপনারা জানেন, নজদী ওহাবীদের (ব্রিটিশদের সহায়তায়) সৌদি রাজতন্ত্র যখন ইসলামের পবিত্র ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন তারা প্রথম যে কাজগুলো করল তার মধ্যে ছিল মাজার, খানকাহ ও ঐতিহ্যবাহী ইসলামি স্থাপত্য ধ্বংস করা। আরব উপদ্বীপের শত শত বছরের ইসলামি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলা হলো, যেন মুসলমানদের ঐতিহাসিক স্মৃতি দুর্বল হয়ে যায়। তাদের পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমা সাংস্কৃতির শিকার বানানো হয়েছে। ফলস্বরূপ আজকের সৌদিতে অপসংস্কৃতির হিড়িক।
নজদী ওহাবীরা আপাতত দৃষ্টিতে সরাসরি ইসলামবিরোধী শক্তি নয়, বরং তারা ইসলামের ছদ্মাবরণে এমন এক ধর্মীয় কাঠামো দাঁড় করিয়েছে, যা মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধনকে দুর্বল করে। তারা এমন এক ইসলামের ধারণা দিতে চায়, যা অতীত ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন, কেবল শুষ্ক অনুশাসনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলাফল— মুসলমানরা তাদের আত্মপরিচয় হারাচ্ছে এবং ইসলাম একটি কেবলমাত্র ‘কেতাবি’ ধর্মে পরিণত হচ্ছে, যার বাস্তব কোনো সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নেই।
অর্থাৎ তারা ইসলাম থেকে সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো বাদ দিয়ে এমন এক ধর্ম তৈরি করতে চায়, যা একদিকে পাশ্চাত্য আধিপত্যের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না, অন্যদিকে মুসলিম মানসে বিজাতীয় সংস্কৃতির জায়গা তৈরির সুযোগ করে দেয়। তাই ইসলামী ঐতিহ্য, দিবস, মাজার, খানকাহ ও ইসলামের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা এবং এগুলো সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।
অতএব শবেবরাত হালুয়া-রুটি রাতের গোসল দলবেঁধে কবর জিয়ারত, রাতে ইবাদত — সবাই করতে হবে। এটা আমাদের মন ও মননকে ইসলামে আবদ্ধ করবে, আমাদের কালচারাল দরিদ্রতা থেকে রক্ষা করবে।
— আছেমী নামদার





