চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল এই বিনিয়োগকে বন্দর উন্নয়নের বড় সুযোগ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও বন্দর বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদে এর আর্থিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক বড় হলেই তা দেশের জন্য লাভজনক হবে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাদের ভাষ্য, প্রকৃত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পাশাপাশি রাজস্ব বণ্টন, পরিচালন ব্যয়, মুনাফা প্রত্যাবাসন (Profit Repatriation), রয়্যালটির কাঠামো এবং চুক্তির মেয়াদ—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ যে পরিমাণ আয় করছে, বিদেশি অপারেটর দায়িত্ব নিলে সেই আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অপারেশন ফি ও মুনাফা হিসেবে দেশের বাইরে চলে যাবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের প্রকৃত আর্থিক প্রাপ্তি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত রয়্যালটি বা রাজস্ব ভাগাভাগির কাঠামো যদি বিদ্যমান আয়ের তুলনায় কম হয় এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠান দ্রুত তাদের বিনিয়োগের অর্থ ও মুনাফা তুলে নিতে সক্ষম হয়, তাহলে চুক্তির সামগ্রিক অর্থনৈতিক সুবিধা প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে। এজন্য তারা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিশ্লেষণ ও স্বাধীন মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন।

এদিকে বন্দর ও শিপিং খাতের পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যদি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব বৈশ্বিক শিপিং নেটওয়ার্ককে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে স্থানীয় শিপিং এজেন্ট ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। যদিও এ ধরনের আশঙ্কা চুক্তির চূড়ান্ত শর্তের ওপর নির্ভর করবে বলে তারা উল্লেখ করেন।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ আরও বলেন, ঘোষিত ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রকৃত কাঠামো জনসম্মুখে স্পষ্ট করা জরুরি। তাদের মতে, বিনিয়োগের একটি বড় অংশ যদি সরঞ্জাম ক্রয়, ঋণনির্ভর অর্থায়ন বা ভবিষ্যৎ ব্যয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে এর আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র বা বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর পড়তে পারে। একই সঙ্গে সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি হালনাগাদ এবং বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধযোগ্য ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।

এ কারণে বিশেষজ্ঞরা চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে এর আর্থিক, কারিগরি ও কৌশলগত দিকগুলো স্বাধীনভাবে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হওয়ায় যেকোনো সিদ্ধান্তে জাতীয় স্বার্থ, দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব নিরাপত্তা এবং সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

  • মসজিদের ক্ষতিগ্রস্ত স্থান।