চট্টগ্রাম বন্দরে “ডিপি ওয়ার্ল্ড” কী ফ্যাসিলিটিস নিয়ে আসবে সেটা কেউ না জানলেও, তারা সাথে করে “গৃ’হ’যু’দ্ধ” নিয়ে আসতে পারে এবং গৃহযু”দ্ধতে আগ্রহী অংশের হাতে লজিস্টিকস ও অস্ত্র সাপ্লাইও যে দিতে পারে সেটা ‘পোর্ট পলিটিক্স’ বুঝেন এমন যে কেউ বুঝতে পারবেন,
সোমালিয়ার বোসাসো বন্দর, সোমালিল্যান্ডের বারবেরা বন্দর, ইউক্রেনের টিআইএস টার্মিনাল ও সুদানের গৃহযু”দ্ধ যার সরাসরি প্রমাণ বহন করে।
আরব আমিরাত ও তার ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদ ও লজিস্টিক সহযোগিতায় সোমালিল্যান্ড থেকে বের হয়ে সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতা ঘোষণা, সুদানের গৃহযু”দ্ধ এবং ইউক্রেন কর্তৃক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে “ইন্টারন্যাশনাল স্পন্সারস অফ ওয়ার বা আন্তর্জাতিক যুদ্ধের পৃষ্ঠপোষক” হিসেবে ঘোষণা দেয়া – এসব সুস্পষ্ট ভূরাজনৈতিক উদাহরণগুলোকে অবশ্যই সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দিলে সামনে বড় একটা বিপদ ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হচ্ছে- ডিপি ওয়ার্ল্ড চট্টগ্রাম বন্দর কাম টার্মিনালের দায়িত্ব নিতে পারলে চট্টগ্রাম বন্দরে ই”ন্ডিয়া, আ”মেরিকা ও ই”সরাইলের সরাসরি উপস্থিতি নিশ্চিত হবে।
কারণ এই রাষ্ট্রগুলোর একে অপরের সাথে তথ্য আদান-প্রদান ও লজিস্টিকস সাপোর্টের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি রয়েছে। এখানে আমি শুধু একটা দিক আলোচনা করব-
২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে “আব্রাহাম অ্যাকর্ড” চুক্তি অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর ২০২১ সালে এই চুক্তির মধ্যে ই”ন্ডিয়াকে যুক্ত করে এর নাম রাখা হয় ‘ইন্দো-আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ (Indo-Abrahamic Alliance)।
এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে এই চার শক্তির মধ্যে একটি জোট তৈরি হয়, যেটির নাম- আই-টু-ইউ-টু (I2U2) বা (India, Israel, UAE, USA) গ্রুপ।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে এই চার শক্তি মিলে নতুন একটা পরিকল্পনা করে। তারা তুরস্ক, চীন, পাকিস্তান, মিশর ও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন একটি অর্থনৈতিক লজিস্টিক রুট তৈরির পরিকল্পনা করে। যার নাম দেয়া হয় “আইমেক (IMEC) করিডোর”। এটি সমুদ্র পথ ও রেলপথের সমন্বয়ে গঠিত। এই রুটে তারা মধ্যপ্রাচ্যের আরো কিছু দেশ ও ইউরোপকে যুক্ত করেছে।
আইমেক করিডোরের মূল ফোকাস হচ্ছে ইsরাইলের হাইফা বন্দর (কেন্দ্র), ভা”রতের মুন্দ্রা, কান্দলা ও জওহরলাল নেহেরু পোর্ট এবং আরব আমিরাতের (UAE) জেবেল আলী পোর্ট (দুবাই), খলিফা পোর্ট (আবুধাবি) এবং ফুজাইরাহ পোর্ট। এগুলো মূল।
পুরো রূটটি হচ্ছে –
ভা”রত (পশ্চিম উপকূলীয় বন্দরসমূহ) ➔ [সমুদ্রপথ] ➔ সংযুক্ত আরব আমিরাত (জেবেল আলী/ফুজাইরাহ) ➔ [রেলপথ] ➔ সৌদি আরব ➔ জর্ডান ➔ ইsরায়েল (হাইফা বন্দর) ➔ [সমুদ্রপথ] ➔ ইউরোপ (গ্রিস/ইতালি/ফ্রান্স)।
এই করিডর স্বাক্ষরিত হওয়ার পরের দিনই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন এবং এর বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলেছেন।
আইমেক (IMEC) রুট নিয়ে মিশরের বড় ধরনের কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক আপত্তি রয়েছে।
চীন মনে করে, আইমেক (IMEC) রুটটি ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (Belt and Road Initiative – BRI)কে কাউন্টার বা প্রতিরোধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে মা”র্কিন যু”ক্তরাষ্ট্র এবং ভা”রত যৌথভাবে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব কমাতেই মধ্যপ্রাচ্যকে এই রুটে যুক্ত করেছে।
আইমেক(IMEC) রুট নিয়ে ইরানের কৌশলগত, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত এবং অর্থনৈতিক আপত্তি রয়েছে। ইরান এই করিডোরটিকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের মা”র্কিন ও ইsরায়েলি চক্রান্ত হিসেবে দেখে।
ইরানের মূল আপত্তি হলো এই রুটে ইsরায়েলের হাইফা বন্দরের (Port of Haifa) কেন্দ্রীয় ভূমিকা।
আইমেক (IMEC) রুট নিয়ে পাকিস্তানেরও তীব্র কৌশলগত ও অর্থনৈতিক আপত্তি রয়েছে। পাকিস্তান এই করিডোরটিকে তাদের জাতীয় স্বার্থ এবং ভৌগোলিক গুরুত্বের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
পাকিস্তান মনে করে, আইমেক করিডোর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভা”রত, ইsরাইল ও আ”মেরিকার যৌথ উদ্যোগ। পাকিস্তান ও চীনের যৌথ মেগা প্রজেক্ট সিপেক (China-Pakistan Economic Corridor – CPEC)-এর বিরুদ্ধে একটি বড় ষড়যন্ত্র।
পাকিস্তান এবং চীনের সিপেক (CPEC) এর মূল লক্ষ্য হলো পাকিস্তানকে মধ্যপ্রাচ্য, সেন্ট্রাল এশিয়া এবং ইউরোপের বাণিজ্যের প্রধান ট্রানজিট হাব বানানো।
আইমেক(IMEC) রুটটি সরাসরি সিপেক-এর গুরুত্ব নষ্ট করে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে পাকিস্তানের অভিযোগ এবং এজন্য আইমেক করিডরের ব্যাপারে পাকিস্তানের বড় ধরনের উদ্বেগ ও আপত্তি রয়েছে।
বাংলাদেশের আপত্তি কোথায়??
আইমেক করিডোরের ব্যাপারে বাংলাদেশের বড় ধরনের আপত্তি থাকা উচিত-
প্রথমত:
আইমেক করিডোরের মূল কেন্দ্রবিন্দু ইsরাইলের হাইফা বন্দর। এর শুরু ই”ন্ডিয়ান পোর্টস। এতে চীন, পাকিস্তান, ইরান, তুরস্ক ও মিশর এর মত বাংলাদেশের বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোকে বাদ দেয়া হয়েছে। বিপরীতে ভা”রত, ইsরাইল ও আ”মেরিকার মত বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য হুমকি রাষ্ট্রগুলো আইমেক করিডোরের কেন্দ্রবিন্দুতে। এর পুরো লজিস্টিক সাপোর্ট দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। এই করিডোরে বাংলাদেশ যুক্ত হলে কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ ইsরাইলকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হবে। এমনকি উক্ত সিন্ডিকেট বাংলাদেশকে “ইন্দো-আব্রাহাম অ্যাকর্ড” এর অংশ হতে বাধ্য করতে পারে। যা বাংলাদেশের মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
দ্বিতীয় আপত্তির কারণ হলো –
সিঙ্গাপুর পোর্টের মত আমরা চাই চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি রিজিওনাল হাব বানাতে। কিন্তু আইমেক করিডোরে রিজিওনাল হাব হবে ই”ন্ডিয়া এবং ইsরাইল। এতে সহযোগিতা করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। বাংলাদেশে থাকবে এখানে দুধভাত হিসেবে। অর্থাৎ বাংলাদেশে একটা ফিডার ভেসেল পোর্ট হিসেবেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড ইন্ডিয়াকে বাদ দিয়ে কখনোই চাইবে না বাংলাদেশ রিজিওনাল হাব হোক। কারণ ইতিমধ্যে আরব আমিরাত ই”ন্ডিয়ায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে এবং অনেকগুলো চুক্তি করে ফেলেছে।
আরো উল্লেখ্য – আইমেক করিডোর সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়ার চর ও কেরানীগঞ্জের পানগাঁও বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনাল ইউরোপীয় কোম্পানি এপিএম টার্মিনাল এবং মেডলগ লিজ নিয়ে নিয়েছে। আমরা এটারও বিরোধিতা করেছি।
কারণ আমাদের স্বপ্ন আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর একদিন সিঙ্গাপুর পোর্টের মতো রিজিওনাল হাব হবে। এবং এই হাব বানাতে হলে অবশ্যই দেশীয় অপারেটর ছাড়া সম্ভব নয়। এই কারণে সিঙ্গাপুর পোর্টের তিনটি কন্টেইনার টার্মিনালের একটিতেও সিঙ্গাপুর সরকার কোনো বিদেশী অপারেটর নিয়োগ দেয় নাই। আমরাও এই ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরকে অনুসরণ করতে চাই।
তৃতীয় আপত্তি হচ্ছে-
গৃহযু”দ্ধ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের বেশ কিছু পক্ষ বাংলাদেশে গৃহযু”দ্ধ নিয়ে আসতে চেয়েছে, এখনো চাচ্ছে, ভবিষ্যতেও তারা চাইবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম যদি আমরা বিশ্বব্যাপী দেখি তাহলে দেখব যে, ডিপি ওয়ার্ল্ড অনেক দেশেই গৃহযু”দ্ধের অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। গৃহযু”দ্ধে আগ্রহীদের হাতে অ”স্ত্রের সাপ্লাই দিয়েছে।
এসব কারণে আমরা চাই না- ডিপি ওয়ার্ল্ডের মত একটি বিতর্কিত পোর্ট অপারেটর বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার এবং অর্থনীতির লাইফ লাইন চট্টগ্রাম বন্দরে আসুক।
মুহম্মদ জিয়াউল হক
আহ্বায়ক, স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি
- মার্কিন-ইরান চুক্তি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না নেতানিয়াহু, 'গণহত্যার ভীতি' ছড়িয়ে নিজের ব্যর্থতা ঢাকছেন বলে ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের বিস্ফোরক দাবি