বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো (এসওই) এক বছরে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৮৮২ বিলিয়ন টাকা ব্যয় করিয়েছে যা দেশের অন্যতম বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয় কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়া এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা এখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান লোকসানের কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মদক্ষতা ও আর্থিক ঝুঁকি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফল আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত এক অবহিতকরণ কর্মশালায় উপস্থাপন করা হয়। বিশ্বব্যাংক, অর্থ বিভাগের সাথে সমন্বয় করে এ কর্মশালার আয়োজন করে। বিশ্বব্যাংক নিয়োজিত পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) অব বাংলাদেশ এ গবেষণা পরিচালনা করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়কৃত লোকসান দাঁড়ায় ৪৪১ বিলিয়ন টাকা। একই সময়ে ভর্তুকি ও উন্নয়ন সহায়তাসহ সরকারের মোট নিট আর্থিক সহায়তা বেড়ে প্রায় ৮৮২ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছায়, যা দেশের জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশের সমান।

কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিশ্বব্যাংকের লিড গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট সুরাইয়া জান্নাত কর্মশালার প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হাসান খালেদ ফয়সাল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সামষ্টিক আর্থিক পরিস্থিতির ওপর উপস্থাপনা দেন। অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব রাহিমা বেগম রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সংস্কার কৌশল ২০২৫-২০৩০ তুলে ধরে বক্তব্য দেন।

বিশ্বব্যাংকের লিড পাবলিক সেক্টর স্পেশালিস্ট অঁরি ফোরতাঁ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট ইমানুয়েল ফ্রাঙ্ক স্টেইনহিলপার বৈশ্বিক প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করেন। পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশীদ আলম বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মদক্ষতা ও ঝুঁকি বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশ্বব্যাংকের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান এবং সমাপনী বক্তব্য দেন নাজমুস সাদাত খান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেই সবচেয়ে বেশি লোকসান হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) একাই ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৪৪ বিলিয়ন টাকার বেশি লোকসান করেছে। উচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে উচ্চ ক্ষমতা ভাড়া পরিশোধ এবং উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম ট্যারিফ নির্ধারণকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক প্রভাবিত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, বিতর্কিত বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি এবং দুর্বল করপোরেট সুশাসন খাতটির আর্থিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

বড় লোকসানি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও রয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ এবং সার, চিনি ও পাট খাতের কয়েকটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক থাকলেও অনেক উৎপাদনমুখী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিক লোকসান বহন করছে।

গবেষণায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় গভীর সুশাসন সংকটের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। খণ্ডিত আইন, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবকে দুর্বল পারফরম্যান্সের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনাও করেছে। এতে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদে মুনাফার হার (রিটার্ন অন অ্যাসেটস) ছিল ঋণাত্মক ৫ দশমিক ২ শতাংশ। বিপরীতে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এ হার ছিল ইতিবাচক ৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে প্রায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। গবেষণায় বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ১০ শতাংশ সম্পদে মুনাফা অর্জন করতে পারে এবং ভর্তুকিনির্ভরতা কমাতে সক্ষম হয়, তাহলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি আর্থিক সম্পদ সংগ্রহ করতে পারবে।

সংকট উত্তরণে গবেষণা প্রতিবেদনে বাণিজ্যিকভাবে সক্ষম রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, স্বাধীন ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন, আর্থিক তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা জোরদার, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং একচেটিয়া খাতগুলোতে ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে লোকসান করা এবং কৌশলগত জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন নেই—এমন প্রতিষ্ঠান ধাপে ধাপে বেসরকারিকরণ বা বন্ধ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

 

সুত্রঃ বণিক বার্তা 

  • মসজিদের ক্ষতিগ্রস্ত স্থান।