তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে তিনি পশ্চিমা মহলে গ্রহণযোগ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তার নিয়োগকে কূটনৈতিক মহল ‘সতর্ক পুনঃসমন্বয়’ হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ইস্যু ও প্রস্তাবিত আরাকান মানবিক করিডর নিয়ে তার আগের অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি, ভারতের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ভারসাম্যের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে- এই নিয়োগ কি আরাকান করিডর বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে? গতকাল বুধবার ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য স্টেটসম্যানের একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খলিলুর রহমান পশ্চিমা নীতিনির্ধারণী মহলে একজন সজ্জন ব্যক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ। ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন একটি তুলনামূলক একপেশে হিসেবে বিবেচিত বাণিজ্য চুক্তির প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে এগোচ্ছে, তখন তার নিয়োগ তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। গত বছর তাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বিএনপি নেতৃত্বের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও।
ভারতে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক আর চক্রবর্তী বলেন, ‘খলিলুর রহমান বিএনপির অংশ না হয়েও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এসেছেন, যা বিস্ময়কর। তিনি তথাকথিত টেকনোক্র্যাট কোটার মাধ্যমে এসেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তার নিয়োগ প্রমাণ করে তারেক রহমানের আমলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব অব্যাহত থাকবে।’
তবে ভারত সরকারিভাবে তার নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছেন, পারস্পরিক অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা রয়েছে।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সময়ে খলিলুর রহমান রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো, তিনি ‘আরাকান করিডর’ তৈরির পক্ষে প্রভাবশালী কণ্ঠগুলোর অন্যতম ছিলেন। এই মানবিক করিডর চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশ হয়ে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পৌঁছানোর একটি পথ হিসেবে ভাবা হয়। এই করিডরের মাধ্যমে সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানো সহজ হতো। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে রাখাইনে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মায়ানমারের সামরিক জান্তার মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে।
সমর্থকদের যুক্তি, এমন একটি করিডর মানবিক ও কৌশলগত দুই দিক থেকেই উপকারী হতে পারে। এটি দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিয়ে ঢাকার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে সহায়তা করবে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশকে দায়িত্বশীল আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তবে সমালোচকরা সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তুলে ধরেছেন।
চক্রবর্তী আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিতে খলিলুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাই বিএনপি সরকার ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু আদায়ের জন্য তার ওপর নির্ভর করতে পারে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিন আগে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশের টেক্সটাইল কারখানাগুলো কিছুটা স্বস্তি পায়। এতে শুল্ক কমানো হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ওপর শূন্য শুল্কের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে চুক্তিতে বছরে সাত লাখ টন গমসহ আরও বেশি মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবং ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ‘যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থ বিপন্ন করে’–এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম না কেনার শর্তও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটি সূক্ষ্ম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। খলিলুর রহমানের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে হবে, অন্যদিকে ঢাকায় চীনের স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রভাব সীমিত করতে চায়। ঢাকায় নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ‘চীনের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের সম্পৃক্ততার ঝুঁকি’ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
যে মানবিক করিডরের ধারণাকে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একসময় সমর্থন করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়, সেটি বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অবস্থানের ওপর। সূত্র: দ্য স্টেটসম্যান
- ছবি সংগৃহীত