ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোট হবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে ভোট দিতে জনগণকে আহ্বান করতে পারবেন না বলে নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোট হবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে ভোট দিতে জনগণকে আহ্বান করতে পারবেন না বলে নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল কমিশন এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি সব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছে। উল্লেখ্য, ১১ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিতদের মাধ্যমে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা শুরুর ১৮ দিন পর এ নির্দেশনা জারি করল নির্বাচন কমিশন। উপদেষ্টাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার শুরু করার পর থেকেই তাদের এ রকম প্রচারের সুযোগ আছে কিনা—এ প্রশ্নটি বিভিন্ন মহলে আলোচিত ছিল।
ভোটের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এমন নির্দেশনা জারি হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গতকাল নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা যখন বিষয়টি বুঝতে পেরেছি যে গণভোটের প্রচারণায় আইন ভঙ্গ হচ্ছে, তখনই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। গত কিছুদিন ধরেই আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি, এর আগে আমি একটা টেলিভিশনেই বলেছি, এ রকম প্রচারণা আইনবিরোধী।’
চলতি মাসের ১১ তারিখ ‘আমাদের সবার স্বপ্নের বাংলাদেশ বাস্তবে গড়ার জন্য হ্যাঁ-তে সিল দিন’ শীর্ষক জনগণকে আহ্বান জানানো একটি ফটোকার্ড গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের দেয়া হয় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে। গণভোট ২০২৬ লেখা ওই ফটোকার্ডে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লোগোও ছিল। ফটোকার্ডের নিচেই প্রেস উইংয়ের বার্তায় বলা হয়, ‘আজ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত এমন আটটি ফটোকার্ড শেয়ার করা হবে। গণভোটের প্রচারণার অংশ হিসেবে এ কার্যক্রম।’
১১ জানুয়ারি শুরু হয়ে গতকাল পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটে অংশ নিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার বিষয়ে প্রচারণা চলছিল, যেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছেন। কিন্তু গতকাল জারি করা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬-এর বিধানাবলির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক জানানো যাচ্ছে যে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোট বিষয়ে জনগণকে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন; তবে তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বা ‘না’-এর পক্ষে ভোট প্রদানের জন্য জনগণকে কোনোভাবে আহ্বান জানাতে পারবেন না।’
নির্দেশনায় এ ধরনের প্রচারণা কার্যক্রমকে দণ্ডনীয় হিসেবে উল্লেখ করে আরো বলা হয়েছে, ‘এ ধরনের কার্যক্রম গণভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে, যা গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।’ উল্লিখিত বিধান অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১১ জানুয়ারিতে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গণভোটের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য গণমাধ্যমকে অবহিত করেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘“ইয়েস” ভোটের বিষয়ে চিফ অ্যাডভাইজার বলেছেন যে ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট ইয়েস ভোটের জন্য ক্যাম্পেইন করবে এবং করছে। এ বিষয়ে অ্যাওয়ারনেস বিল্ডআপ করবে। এ বিষয়ে ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট লিগ্যাল অপিনিয়ন নিয়েছিল। টপ এক্সপার্টরা লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট “ইয়েস” ভোট চাইতে পারে, এ বিষয়ে কোনো লিগ্যাল প্রতিবন্ধকতা নেই।’
গত ১৯ জানুয়ারি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সিল দেয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভিডিও বার্তা দেয় প্রেস উইং, যা গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়। ভিডিও বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। গণভোটে আপনি “হ্যাঁ” ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ আর নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ।’
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা গণভোটের পক্ষে প্রচারে মাঠে নামেন ১৫ জানুয়ারি। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বলা হয়, নির্বাচন মনিটরিং ও সহায়তা প্রদান সংক্রান্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা আজ ১৫ জানুয়ারি থেকে এ প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছেন। এ কার্যক্রমের আওতায় তারা আগামী ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় গণভোটের গুরুত্ব, উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করবেন।
১৬ জানুয়ারি বান্দরবানে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে মঞ্চের পেছনে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে ব্যানার প্রদর্শিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক। ২০ জানুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাভারে ‘ভোটের রিকশা’ উদ্বোধনকালে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-তে রায় দিতে আহ্বান জানান।
গতকাল নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা বিষয়ে মতামত জানতে যোগাযোগ করা হলে প্রেস সচিব প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক) অধ্যাপক আলী রিয়াজের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
যোগাযোগ করা হলে অধ্যাপক আলী রিয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাটি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। বিষয়টি যাচাই-বাছাই ও বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে।’
উল্লেখ্য, গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে ২৪ জানুয়ারি সিলেটের বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় অধ্যাপক আলী রিয়াজ গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে কোনো আইনগত বাধা নেই বলে জানিয়েছিলেন। তিনি সেই সভায় বলেন, ‘বিদ্যমান সংবিধান, আরপিও, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ কিংবা এ গণভোটসংক্রান্ত অধ্যাদেশের কোথাও বলা নেই যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ইতিবাচক পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলতে পারবেন না। প্রচারণায় আইনগত বাধা আছে এমন কোনো রেফারেন্স কেউ দেখাতে পারবে না।’
সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্সে সিলেট বিভাগীয় প্রশাসন এ সভার আয়োজন করেছিল। বিভাগীয় সদর এবং জেলা ও উপজেলায় কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।
উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের প্রচারণা কর্মসূচির পাশাপাশি সরকারিভাবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা বিষয়ে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আসন্ন গণভোটের পক্ষে প্রচারণাসংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দেয়া নির্দেশনার আলোকে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে লিখিত নির্দেশনা জারির আগে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে এক বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণার আহ্বান জানান। সেই আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি ব্যাংক প্রচারণা শুরু করলেও কিছু ব্যাংক লিখিত নির্দেশনা না পাওয়ায় তা বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করে। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত নির্দেশনা জারি করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচারণা চালানো দণ্ডনীয়। তারা বলছেন, এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে সরকারি কর্মকর্তাদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানোর বিষয়ে শুরুতেই তা বন্ধে নির্দেশনা জারি করা উচিত ছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইনি জটিলতা ও সময়ক্ষেপণের কারণ থাকলেও এটা আরো আগে করলে এসব (আইনি জটিলতা) এড়ানো যেত।’
তিনি আরো বলেন, ‘যদি সরকারি কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশন আইনের এ বিধানগুলো আগেই আমলে নিত তাহলেই ভালো হতো এবং এত জটিলতারও সৃষ্টি হতো না।’
হ্যাঁ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের প্রচারণা ইসির গতকালের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা জানতে চাইলে জবাবে ইসি আব্দুর রহমানেল মাছউদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘না। আমরা তো এমন কিছু দেখি না। কারণ উপদেষ্টা ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রচারণার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমরা তো লিমিট করছি সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর। এখন উপদেষ্টা মহোদয়রা দেশের কর্মচারী নন। অর্থাৎ প্রচলিত অর্থে উনারা সরকারি কর্মকর্তা নন।’
এ বিষয়ে তিনি আরো ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘উপদেষ্টারা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে প্রচারণা চালাতে পারবেন। উনারা করবেন কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা তাদের সরকারি অফিস ব্যবহার করে এ কাজ করতে পারবেন না। অর্থাৎ, মূল বিধিনিষেধটি হলো সরকারি কর্মকর্তাদের অফিস ব্যবহার করে প্রচারণা চালানোর বিষয়ে।’
এরই মধ্যে হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচারণা চালানো সরকারি কর্মচারীরা কোনো শাস্তির আওতায় পড়বেন কিনা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, আইনে বলা থাকলেও বর্তমানে কঠোর পদক্ষেপের চেয়ে সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আপাতত (শাস্তি নিয়ে) আমরা চিন্তাভাবনা করছি না। এখন আমাদের প্রিভেনশন ফেজ। এখন যেহেতু ওটা (আচরণবিধি) কিছু ভাঙা হচ্ছে বলেই এমন নির্দেশনা জারি হয়েছে। এছাড়া কেউ এটা ইচ্ছা করে করেননি। এটা না বুঝেই দলগতভাবে হয়তো তারা করেছেন। সেজন্য আমরা তাদের সচেতনতামূলক চিঠি দিয়েছি। এর পরও যদি অতিউৎসাহী কর্মকর্তা বা কেউ অমান্য করেন তাহলে তখন হয়তো চিন্তা করা যাবে যে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
সুত্রঃ বণিক বার্তা
- এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান। সংগৃহীত ছবি
