চট্টগ্রাম বন্দরের একমাত্র বিশ্বমানের কনটেইনার টার্মিনাল ‘নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল’ বিদেশি সিন্ডিকেটের হাতে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সংগঠন ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’। আজ শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেল ৫টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, সম্প্রতি দৈনিক বণিক বার্তা-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে—আগামী রোববার, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সরকার নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে কনসেশন চুক্তির মাধ্যমে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’ এই সিদ্ধান্তকে দেশবিরোধী আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানায়।

সমাবেশে শিক্ষার্থীরা তাদের বক্তব্যে বলেন—

১. অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কেবল ‘টার্মিনাল অপারেটর’ হিসেবে নয়, বরং আফ্রিকান মডেল অনুসরণ করে ‘কনসেশনিয়ার’ হিসেবে নিয়োগ দিতে যাচ্ছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা, দেশীয় নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

২. উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে বিডের সুযোগ না দিয়ে আওয়ামী রেজিমের অনুসৃত পথে অনৈতিকভাবে চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

৩. দেশীয় ব্যবস্থাপনায় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে যেখানে প্রতি কনটেইনার (TEU) গড়ে প্রায় ১৬১ মার্কিন ডলার রাজস্ব পাওয়া যায়, সেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কনসেশন দিলে আনুমানিক মাত্র ২২–২৫ মার্কিন ডলার পাওয়া যাবে। এতে বছরে শুধু কনটেইনার হ্যান্ডলিং খাতেই কয়েকশো মিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

৪. দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর বিদেশি কনসেশনিয়ারের নিয়ন্ত্রণে থাকলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।

৫. গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ১০ দিনের মধ্যে অস্বাভাবিক দ্রুততায় চুক্তি সম্পাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা স্বচ্ছতা ও যথাযথ যাচাই-বাছাই নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করে।

৬. I2U2 (India, Israel, UAE, USA) মাল্টিলেটারাল জোটের সদস্য হওয়ায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পরোক্ষ উপস্থিতি ও প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে যে কোনো মুহূর্তে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

৭. দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ‘প্রোপাগান্ডা মেশিন’ জনগণকে বিভ্রান্ত করতে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। যেমন—‘সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের বন্দর বিদেশিরা পরিচালনা করে’—এমন দাবি করা হচ্ছে, যা বাস্তবসম্মত নয়। সিঙ্গাপুরে কোনো কনটেইনার টার্মিনালই বিদেশি অপারেটরের হাতে নেই এবং ভিয়েতনামেও এককভাবে কোনো বিদেশি কোম্পানিকে টার্মিনাল হস্তান্তর করা হয়নি। এককভাবে বিদেশিদের কাছে বন্দর পরিচালনার উদাহরণ মূলত আফ্রিকান রাষ্ট্র ও কিছু ক্ষেত্রে ভারতে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো—সিঙ্গাপুর মডেল পরিহার করে অন্তর্বর্তী সরকার কি বাংলাদেশকে আফ্রিকান মডেলে পরিণত করতে চায়?

সমাবেশ থেকে সরকারের প্রতি দাবি জানানো হয়—ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অন্যথায় দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন বক্তারা।

সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’র আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক, যুগ্ম আহ্বায়ক মুহিউদ্দিন রাহাত, দপ্তর সদস্য সাইফুল ইসলাম, জুবায়েদুল ইসলাম শিহাব, জাবির বিন মাহবুব, আল আমিনসহ প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী।

  • ছবি সংগৃহীত