বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরেই কাঠামোগত দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনার সমস্যায় জর্জরিত। অর্থায়নের স্বল্পতা, চিকিৎসক-নার্স ও টেকনোলজিস্ট সংকট, সেবার মানে বৈষম্য, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক।
মানুষের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্য খাত বরাবরই অবহেলার শিকার। স্বাস্থ্য খাতে জনবল, অর্থায়ন ও সুশাসনের ঘাটতি নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে টেকসই পরিবর্তন আনতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা অপরিহার্য। অন্যথায় বাজেট বৃদ্ধি বা নতুন প্রকল্প গ্রহণ করেও বাস্তব পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের সংকট কেবল বাজেটস্বল্পতার নয়; সুশাসনের ঘাটতি, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, দুর্বল পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বহু প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে, ফলে সেবাদানের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। আবার কোথাও প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল থাকলেও সঠিক স্থানে পদায়ন না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত মান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীর চাপ বাড়ছে, একই সঙ্গে চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর কাজের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই রোগী ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও সেবার ধারাবাহিকতায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে গুণগত সেবাকে আরো অনিশ্চিত করে তুলছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অন্যতম সর্বনিম্ন।
বাজেট ও নীতিগত সংস্কারের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেবল বরাদ্দ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না, বরং বিদ্যমান বাজেট কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না সেই ইকোসিস্টেম বুঝতে হবে। বর্তমান বাজেটের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল আগামীতে জিডিপির অন্তত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দের জোরালো দাবি তোলা সম্ভব। স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারকদের উচিত কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ঢাকা ও ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলো সরাসরি পরিদর্শন করা, যাতে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্রটি বোঝা যায়। একই সাথে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস গঠন ও সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে হবে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, আদর্শ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপাত হওয়া উচিত ১:৩:৫। অর্থাৎ একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স ও পাঁচজন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী থাকা প্রয়োজন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ কোটি মানুষের বিপরীতে সরকারি খাতে চিকিৎসক প্রয়োজন প্রায় ১ লাখ সাড়ে ৩ হাজার। সে অনুপাতে নার্স দরকার ৩ লাখ সাড়ে ১০ হাজার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন ৫ লাখ সাড়ে ১৭ হাজার। বাস্তবে দেশে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের ঘাটতি ১৭ শতাংশ। তবে সংকট সবচেয়ে তীব্র নার্স ও অন্যান্য সহায়ক জনবলে—নার্সের ঘাটতি ৮২ শতাংশ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি ৫৬ শতাংশ। এদিকে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে মোট অনুমোদিত পদের ৩২ শতাংশই শূন্য পড়ে আছে। চলতি বছর তিন হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হলেও সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় তা এখনো অপ্রতুল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের উপজেলাভিত্তিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর অর্ধেকেরও বেশি চিকিৎসক পদ শূন্য রয়েছে। সবচেয়ে বেশি পদ শূন্য বরিশাল ও রংপুর বিভাগে। পদায়ন করা হলেও এসব অঞ্চলের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসকরা বেশি দিন থাকতে চান না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো এবং জনসংখ্যার অনুপাতে তাদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমেদ পারভেজ জাবীন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো এবং জনসংখ্যার অনুপাতে তাদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ, যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার করা এবং পুষ্টিহীনতা মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে ক্লিনিক্যাল ও ল্যাবরেটরি সেবার মানোন্নয়ন করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিয়ে সুলভ বা প্রায় বিনামূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে বাজেট বৃদ্ধি ও সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারলে স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে।’
এছাড়া দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে তীব্র শয্যা সংকট রয়েছে, বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এ সংকট আরো প্রকট। ফলে অনেক রোগীকে বারান্দা বা মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। রোগীর তুলনায় শয্যার অপ্রতুলতা এবং আইসিইউ ও বার্ন ইউনিটের সীমিত সক্ষমতার কারণে অনেকেই সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে বড় শহরে স্থানান্তরও করতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) বার্ষিক প্রতিবেদন ‘হেলথ বুলেটিন ২০২৩’ অনুযায়ী, দেশে সরকারি হাসপাতালে শয্যা রয়েছে ৭১ হাজার ১০০টি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৯৯ হাজার ৯৭৫টি। সব মিলিয়ে মোট শয্যাসংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৭৫। অর্থাৎ প্রতি হাজার মানুষের বিপরীতে গড়ে মাত্র একটি শয্যা।
স্বাস্থ্য খাতে শুধু জনবল নয়, অবকাঠামোগত সক্ষমতার ঘাটতিও বড় সমস্যা। অনেক সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি নেই; আবার যেগুলো আছে সেগুলোর একটি অংশ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল পড়ে থাকে। ফলে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত খরচে পরীক্ষা করাতে হয়।
সার্বিক বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. লেনিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের মূল চ্যালেঞ্জ কেবল বাজেটস্বল্পতা নয়, বরং বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতার অভাব। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে জিডিপির ১ শতাংশের কম বরাদ্দ দিয়েও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের মানহীনতা ও দুর্নীতি রোধে কঠোর তদারকি প্রয়োজন। শুধু চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে জনতুষ্টির রাজনীতি করলেই স্বাস্থ্যসেবার মান ফিরবে না। বরং চিকিৎসাসামগ্রীর সহজলভ্যতা, জনবল কাঠামো পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনা, সুশাসন, দক্ষ জনবল ও বাজেটের সঠিক ব্যবহার—এ চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিন্যাস করাই হবে নতুন সরকারের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ।
সুত্রঃ বণিক বার্তা





