বৈষম্যহীন বাংলাদেশের অসম করনীতি পরিচয় বড়, নাকি নাগরিক অধিকার?

Picture of ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন

ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন

একটি গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার পালাবদল ঘটায় না, বদলে দেয় মানুষের প্রত্যাশাও। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করেছিল, এবার হয়তো রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সমান মর্যাদা ও সমান অধিকারের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনা ছিল শুধু চাকরিতে কোটার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; সেই চেতনা ছিল শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, বাসস্থান ও আইনের চোখে প্রতিটি নাগরিকের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে‌বৈষম্য দূর করতে গিয়ে আমরা কি নতুন বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছি?

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করে আসছে। সেই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারও বলেছিল, পাহাড় ও সমতলে কোনো বৈষম্য থাকবে না এবং সবার পরিচয় হবে একটাই বাংলাদেশি। নির্বাচনের আগেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একই ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

কিন্তু গত ২৯ জুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় উপজাতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৃষি, ব্যবসা ও বেতন আয়কর মুক্ত করার প্রস্তাব সামনে আসার পর নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

 প্রশ্ন হলো, যদি রাষ্ট্রের নীতিই হয় সবার পরিচয় বাংলাদেশি, তাহলে একই রাষ্ট্রে একজন নাগরিককে আয়কর দিতে হবে আর অন্যজন কেবল পরিচয়ের ভিত্তিতে করমুক্ত থাকবেন কেন? এটি কি সমান নাগরিকত্বের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি বৈষম্যের নতুন রূপ?

সরকারের উদ্দেশ্য যদি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আনা হয়, সেটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গমতা, অবকাঠামোর সংকট, শিক্ষা ও চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা শুধু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমস্যা নয়; সেখানে বসবাসরত বহু বাঙালিও একই কষ্টের অংশীদার। একই পাহাড়, একই ভাঙা সড়ক, একই দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং একই কর্মসংস্থানের সংকট তাদেরও বাস্তবতা।

শুধু পাহাড় নয়, বাংলাদেশের হাজারো চরাঞ্চল, নদীভাঙন এলাকা, হাওর, উপকূল এবং প্রত্যন্ত গ্রামের দিকে তাকালেও দেখা যাবে অসংখ্য বাঙালি পরিবার আজও মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের সন্তানদের শিক্ষা অনিশ্চিত, চিকিৎসা সীমিত, যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল এবং অর্থনৈতিক সুযোগ প্রায় নেই। তাহলে পিছিয়ে পড়ার মানদণ্ড কি জাতিগত পরিচয় হবে, নাকি মানুষের প্রকৃত আর্থসামাজিক অবস্থা?

 ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোনো একক অর্থনৈতিক শ্রেণি নয়। তাদের মধ্যেও স্বচ্ছল মানুষ আছেন, ব্যবসায়ী আছেন, শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবার আছে। একইভাবে বাঙালিদের মধ্যেও রয়েছে চরম দারিদ্র্য। তাহলে কেবল পরিচয়ের ভিত্তিতে করছাড় দেওয়া কতটা ন্যায়সঙ্গত? রাষ্ট্রের সহায়তা কি দরিদ্র মানুষ পাবে, নাকি নির্দিষ্ট পরিচয়ের মানুষ পাবে?

এই ভূখণ্ডের ইতিহাস নিয়ে নানা মত থাকলেও রাষ্ট্রের নীতির কেন্দ্রে থাকা উচিত বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ এবং বাংলাদেশের নাগরিক। রাষ্ট্র যদি একদিকে সবাইকে বাংলাদেশি পরিচয়ের কথা বলে, অন্যদিকে পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা অর্থনৈতিক সুবিধা নির্ধারণ করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্তি তৈরি হবে।

আরেকটি বিষয়ও ভাবনার দাবি রাখে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী, অভিবাসন ও অনুপ্রবেশ নিয়ে বহুদিন ধরেই নিরাপত্তা আলোচনা রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ এখনো সীমান্তে “পুশ-ইন” এর চেষ্টা করতেছে

এমন প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা প্রয়োজন, যাতে কোনো সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক বা সামাজিক জটিলতার কারণ না হয়।

শুধু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিচয়ের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি কর-সুবিধা অব্যাহত থাকলে একসময় একটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির ধারণা তৈরি হতে পারে। এর ফলে সমতলে অবস্থিত বাঙালির মধ্যেও বঞ্চনার অনুভূতি জন্ম নিতে পারে।

 রাষ্ট্রের জন্য সেটি কখনোই ইতিবাচক বার্তা নয়। কারণ বাংলাদেশের প্রকৃত আদিবাসী বাঙালি

 সমান অধিকারের রাষ্ট্রে কোনো নাগরিকের মনে এমন অনুভূতি তৈরি হওয়া উচিত নয় যে, আইনের প্রয়োগ তার পরিচয়ের ওপর নির্ভর করছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে মূলধারায় নিয়ে আসতে হলে আয়কর অব্যাহতি কোন সমাধান নয়। প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়ন, মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধি, সমতলের সাথে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে পাহাড় ও সমতলের মানুষ সমান সুযোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। প্রয়োজনের পাহাড়ে নয় বাঙ্গালীদের সাথে মিশে এক যোগে কাজ করবে।

 বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রকৃত চেতনা ছিলঝ কোনো নতুন বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি তৈরি করা নয়; বরং অযৌক্তিক বৈষম্য দূর করা। সহায়তা অবশ্যই দিতে হবে, কিন্তু তার ভিত্তি হওয়া উচিত দারিদ্র্য, ভৌগোলিক বৈষম্য, শিক্ষাগত পিছিয়ে পড়া এবং বাস্তব আর্থসামাজিক অবস্থা। পরিচয় যদি নীতির একমাত্র ভিত্তি হয়ে যায়, তাহলে এক বৈষম্যের জায়গায় আরেক বৈষম্য দাঁড়িয়ে যাবে।

পাহাড় থেকে সমতল, চর থেকে শহর বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক যেন রাষ্ট্রের চোখে সমান মর্যাদা পায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য সেদিনই আসবে, যেদিন কোনো নাগরিককে নিজের পরিচয় নয়, নিজের যোগ্যতা, প্রয়োজন এবং নাগরিক অধিকার দিয়েই মূল্যায়ন করা হবে।

সমতার নামে নতুন বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করা কোনো সংস্কার নয়। রাষ্ট্রের কাছে একজন নাগরিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত বাংলাদেশি।রাষ্ট্র যদি সত্যিই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে চায়, তবে নাগরিককে পরিচয়ে নয়, প্রয়োজনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। পাহাড় থেকে সমতল, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে বাঙালি সবাই যেন সমান আইনি মর্যাদা, সমান সুযোগ ও সমান ন্যায়বিচার পায়। কারণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা নিজেই যদি বৈষম্যের জন্ম দেয়, তাহলে ইতিহাস একদিন সেই রাষ্ট্রকেই প্রশ্ন করবে।

    About The Author

    নরসিংদীর বেলাবোতে মসজিদ-মাদ্রাসায় হামলা ও ভাঙচুর

    ৩৩ নরসিংদীর বেলাব উপজেলার দুলালকান্দি এলাকার বাঁশবাজার কাঁসার বাপেরবাড়ি জোড়া সুন্নতি জামে মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট মুহাম্মদীয়া জামিয়া শরীফ মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটিয়েছে

    Read More »

    নরসিংদীর বেলাবোতে মসজিদ-মাদ্রাসায় হামলা ও ভাঙচুর

    ৩ নরসিংদীর বেলাব উপজেলার দুলালকান্দি এলাকার বাঁশবাজার কাঁসার বাপেরবাড়ি জোড়া সুন্নতি জামে মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট মুহাম্মদীয়া জামিয়া শরীফ মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটিয়েছে

    Read More »

    ভোলাহাটের সুরানপুরে হিংস্র কুকুরের হামলা, একের পর এক ছাগল-ভেড়া নিহত

    ৬৭ চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার সুরানপুর গ্রামে গত কিছুদিন ধরে হিংস্র কুকুরের আক্রমণে একের পর এক ছাগল ও ভেড়া মারা যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কুকুরের কামড়ে আরও

    Read More »

    নোবিপ্রবিতে বেওয়ারিশ কুকুরের হামলায় আহত দুই শিশু, বাড়ছে উদ্বেগ ও অনিরাপত্তা

    ৫৪ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) সংলগ্ন পকেট গেট এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের হামলায় প্রায় পাঁচ বছর বয়সী দুই শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। আহত শিশুদের

    Read More »

    ‘কওমি মাদরাসা যেন টর্চার সেল’, সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি

    ২০ সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল একটি রিলে বাংলাদেশে কওমি মাদরাসাগুলোর শিশুদের ওপর নির্যাতনের একটি ভয়াবহ ভিডিওচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ৬ মিনিটের এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে,

    Read More »

    বাস-হাইসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ১০

    ৫৩ কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার কুদালিয়া এলাকায় বাস ও হাইস মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল আনুমানিক ১০টা

    Read More »

    Table of Contents