ছোট শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রায় ৪৮ বছর ধরে ট্রেন, হাট-বাজার, লঞ্চ ও পথে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে বই বিক্রি করছেন মো. আব্দুর রশিদ প্রামাণিক। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি আজ রোগাক্রান্ত, নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন। সংসার, স্ত্রী, সন্তান, বাড়িঘর—সবকিছু হারিয়ে এখন তাঁর একটাই আক্ষেপ, “আমাকে দেখার মতো পৃথিবীতে কেউ নেই।”
মঙ্গলবার (১ জুলাই) কাঁকনহাট রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনে ওঠার অপেক্ষায় থাকা আব্দুর রশিদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। হাতে একটি কাপড়ের ব্যাগ, যার ভেতরে ও ওপরে ছিল কয়েকটি শিশুতোষ বই। ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে ট্রেনে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।
জীবনের গল্প জানতে চাইলে প্রথমে কোনো কথা বলতে পারেননি রশিদ। চশমার ফাঁক দিয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়তে থাকে অশ্রু। পরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “এক সময় স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল। দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা বেশি করতে পারিনি। সংসারের দায়িত্ব নিতে শিশুদের বই কিনে ট্রেন, স্টেশন, হাট-বাজার ও লঞ্চে বিক্রি শুরু করি। তখন আয় ভালোই হতো।”
তিনি জানান, প্রায় ১০ বছর আগে তাঁর স্ত্রী মারা যান। ছেলে ও মেয়ে দুজনই গার্মেন্টসে চাকরি করলেও তাঁকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করেন না। বর্তমানে তাঁর নিজের থাকার মতো একটি ঘরও নেই। গত তিন মাস ধরে কাঁকনহাট বাজারে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। এর আগে রাজশাহীতে থাকতেন।
আব্দুর রশিদ বলেন, “মানুষের সহায়তায় কয়েকটি বই কিনে বিক্রি করি। পুঁজি বাদে দিনে মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকা আয় হয়। অসুস্থ হলে সেই আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। তখন না খেয়েই থাকতে হয়। নানা রোগে আক্রান্ত হলেও ওষুধ কেনার টাকাও জোটে না।”
যোগাযোগের জন্য তাঁর কোনো মোবাইল ফোন নম্বরও নেই। একটি ফোন কেনার সামর্থ্যও তাঁর নেই বলে জানান তিনি।
অন্য কোনো পেশায় না যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে আব্দুর রশিদ বলেন, “আমি শিশুদের খুব ভালোবাসি। তারা বই পড়ে মানুষ হবে—এই স্বপ্ন থেকেই বই বিক্রির পেশায় এসেছিলাম। কিন্তু এখন আধুনিক নানা ধরনের বই বাজারে আসায় আগের মতো কেউ আমার কাছ থেকে বই কেনে না। সব মিলিয়ে আমি এখন জীবন্ত লাশ হয়ে গেছি।”
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বই বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা এই বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা বর্তমানে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে এগিয়ে এলে জীবনের শেষ সময়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেতে পারেন তিনি।
- কাঁকনহাট রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনে ওঠার অপেক্ষায় রোগাক্রান্ত বই ফেরিওয়ালা মো. আব্দুর রশিদ প্রামাণিক।




