পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৮৬ সালের ১৮ই মে খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলারর তাইন্দং, দিঘীনালা এবং পানছড়ি ইউনিয়নে বসবাসরত বাঙালির জীবনে নেমে আসে নৃশংস, বীভৎস, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় এক কালরাত্রি। ৩৮ হাজার বাঙ্গালীর হত্যাকারী খুনি সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এর সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা এই নৃশংসতা চালিয়েছে। খুনি সন্তু লারমার নির্দেশে জেএসএস সশস্ত্র কমান্ডার বিভাস চাকমা এই গণহত্যা পরিচালনা করে।
ঐ দিন রাত ১টা পর্যন্ত মোট ৫ ঘন্টা ব্যাপী খাগড়াছড়ি জেলার সীমান্তবর্তী মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং, তবলছড়ি ইউপি, পানছড়ি উপজেলা’র ১নং লোগাং ইউনিয়ন,৩নং পানছড়ি সদর ইউনিয়ন ও ৪নং লতিবান ইউনিয়ন (বর্তমানে ৫নং উল্টাছড়ি ইউপি)‘র বাঙ্গালি গ্রামে অগ্নি সংযোগসহ নির্বাচারে গণহত্যা চালায়। শিশু, কিশোর, নারী, পুরুষ, আবাল, বৃদ্ধা, বনিতা যাকে যেখানে পেয়েছে তাকে সেখানেই হত্যা করেছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্রগ্রাম জন সংহতি সমিতি (জেএসএস)‘র অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। সেই সময় বে-সরকারি হিসাবে মাত্র ৫ ঘন্টা সময়ে নিরস্ত্র ও নিরীহ ৮ শত ৫৩ জন বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, আহত করা হয়েছে প্রায় ৫শত জনকে, অপহরণ ও গুম করা হয়েছে আরো কয়েক হাজার বাঙালিকে।
৬ হাজার ২শত ৪০টি বাড়ি সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এতে গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। চারদিকে ক্ষত বিক্ষত.ছিন্নভিন্ন সারি সারি লাশের স্তুপ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল হতভাগ্য মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কিংবা পোড়া হাড়গোড়,সেদিন হতবাক করেছিল পার্বত্য চট্রগ্রামের সাধারণ মানুষকে। এ হত্যাকান্ডকে অনেকেই ৭১ সালের পাকিস্তানি বর্ববরতার সাথে মূল্যায়ন করে বলেছেন, সন্তু লারমার সেই হত্যাকান্ড মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি বর্ববরতাকেও হার মানিয়েছে। বাঙালির রক্তে লালে লাল হয়েছিল সেই দিন চেঙ্গী, মাইনি এবং ফেনী নদীর পানি।
ঘটনার দিন, বিকাল সাড়ে ৪ টা। তাইন্দং গ্রামেরই ৪ জন বালক গরু চরানোর জন্য পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে যায়। দীর্ঘক্ষণ গরু চরানোর পর শান্তি গ্রামের পাশ দিয়ে আসার পথে জেএসএস এর সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনীর একদল সদস্য কোন কারণ ছাড়া বালকদের কোপাতে শুরু করে। এতে কবির আহমদ (১১) পিতা শুক্কুর ঘটনাস্থলেই মারা যায়। অপর ২ জনকে কুপিয়ে গুরুতরভাবে আহত করে। তারা মাটিতে লুটিয়ে কাতরাতে থাকে। চতুর্থ বালক ঝোপের আড়ালে লুকাতে সক্ষম হয় এবং প্রাণে বেঁচে যায়। শান্তিবাহিনী শান্তি গ্রামের দিকে চলে গেলে বালকটি তাইন্দং এলাকার এক মসজিদে গিয়ে উপস্থিত মুসল্লীদের খবর দেয়। ইমাম সাহেব মাত্র মাগরিবের নামায শুরু করেছেন। এ সময় বালকটির কাছ থেকে শান্তিবাহিনীর হামলার খবর শুনে উপস্থিত বাঙালী ও ভিডিপির সদস্যরা উত্তেজিত হয়ে দৌড়ে যায়। তারা আহত বাঙালি ছেলে ২ টিকে উদ্ধার করে এবং নিহতের লাশ নিয়ে চলে আসে। লাশ নিয়ে চলে আসার সময় ১ নং তাইন্দং ইউনিয়নের সামনে বাঙালিদের উপর অতর্কিত গুলি বর্ষণ করে জেএসএস এর সন্ত্রাসীরা।
সেই সাথে আরো ৩০০-৪০০ জন উপজাতি যুবক দাঁ, কুড়াল নিয়ে বাঙালিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। এসময় ২০ জন বাঙালি ঘটনাস্থলে নিহত হয়। হাসপাতালে নেয়ার পর আরো ৬ জন নিহত হয় বলে জানা গেছে। অসহায় বাঙালিদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি সেদিন। বাঙালিরা সামান্যতম প্রতিহত শুরু করলেও জেএসএস এর অস্ত্রের সামনে কেউ দাঁড়াতে পারেনি। দেওয়ানবাজার এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম। তার দুচোখের সামনে ঘটে যাওয়া পৈশাচিক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই বৃদ্ধা। ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই তীব্র ছিল যে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ফাতেমা বেগমের ভাষ্যমতে, সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অতর্কিতভাবে তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। সেই মুহূর্তে তারা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে। ফাতেমা বেগম জানান, হামলাকারীরা তার চোখের সামনেই তার কন্যাকে পাশবিকভাবে ধর্ষণ করে। মায়ের আকুতি কিংবা মেয়ের আর্তনাদ কোনো কিছুই সেই নরপশুদের মন গলাতে পারেনি। এছাড়াও, ফাতেমা বেগমের দুই নাবালক নাতিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে তারা।
পরেরদিন, অর্থাৎ ১৯ই মে স্থানীয় পত্রিকা ‘তাইন্দং নিউজ ২৪’ এ উঠে আসে ঘটনার বিভীষিকাময় চিত্র।
পত্রিকায় বলা হয়, “গতরাতে দেওয়ানবাজার এলাকায় নেমে এসেছিল এক অবর্ণনীয় অন্ধকার। প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ জন উপজাতি যুবক বন্দুক, দেশীয় অস্ত্র, দা ও কুড়াল নিয়ে অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ বাঙালিদের ওপর। এই পৈশাচিক হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৪৮ জন বাঙালির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েকশ মানুষ। হামলার প্রাথমিক পর্যায়েই ঘটনাস্থলে ৩৮০ জন বাঙালি নিহত হন। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৬৮ জনের মৃত্যু ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেদিন রাতে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আজ সকালে এলাকা ঘুরে দেখা গেছে জনশূন্য ধ্বংসস্তূপ আর রক্তের দাগ। প্রিয়জন হারানো মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে তাইন্দংয়ের বাতাস। স্থানীয়রা এই বর্বরোচিত গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন”। (তথ্যসূত্র: দেওয়ানবাজারের বাসিন্দা ফাতেমা বেগমের জবানবন্দি ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম।)
দেওয়ানবাজারের উত্তর পাড়ার বাসিন্দা আবেদ আলী(৭০)। সারাজীবনের হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে গড়া ছোট ঘর আর কয়েকটা গবাদিপশুই ছিল তার শেষ বয়সের সম্বল। কিন্তু সেই অভিশপ্ত রাতে শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা তার সবটুকু কেড়ে নিয়েছে। আবেদ আলী অশ্রুসিক্ত চোখে জানান, সন্ত্রাসীরা যখন গ্রামে ঢুকে গুলি আর চিৎকার শুরু করে, তখন তিনি জীবন বাঁচাতে কোনোমতে ঘরের কোণে লুকিয়ে ছিলেন। কিন্তু সন্ত লারমার বাহিনী তৃষ্ণা কেবল রক্তে মেটেনি। আবেদ আলীর তিনটি গরু ছিল, যা দিয়ে তার সংসার চলত। সন্ত্রাসীরা নিষ্ঠুরভাবে সেই অবলা প্রাণীগুলোকে বের হতে না দিয়ে গোয়ালঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়।লুটের শেষ পর্যায়ে পুরো বাড়িতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। চোখের সামনে নিজের বসতভিটা ছাই হতে দেখেও প্রাণভয়ে টু শব্দ করার সাহস পাননি এই বৃদ্ধ।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনকালে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়া স্বজনহারাদের সান্ত্বনা দেন এবং এই ঘটনার কঠোর বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন খাগড়াছড়ি জেলার সংসদ সদস্য এ কে এম আলিম উল্লাহ। সংসদ সদস্য জানান, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে একটি শক্তিশালী তদন্ত বাহিনী গঠন করা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “জেএসএস বা অন্য যে কোনো সংগঠনের সন্ত্রাসীরাই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।” এছাড়াও স্থানীয় বাঙালি সমাজের ওপর এই সুপরিকল্পিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বাঙালিদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। ঘটনার পর উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হলেও, সেই তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। স্থানীয়দের দাবি, জেএসএস এর সন্ত্রাসীরা দুর্গম পাহাড়ে গা ঢাকা দেওয়ায় এবং তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নাগাল পায়নি। অনেক সন্ত্রাসী ভারতে পালিয়ে গেছে।
তাছাড়াও কুমিল্লাটিলা, শুকনাছড়ি, দেওয়ান বাজার, তাইন্দং এর সংলগ্ন বিডিআর ক্যাম্পে আক্রমণ করে শান্তিবাহিনীর আনুমানিক ১১০ জনের একটি সশস্ত্র টিম। শান্তিবাহিনীর মূল স্ট্রাইকিং টিমটি প্রথম আক্রমণ করে কুমিল্লাটিলা, শুকনাছড়ি, দেওয়ান বাজার এবং তাইন্দং এলাকার সংলগ্ন বিডিআর ক্যাম্পগুলোর ওপর। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যাতে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে না পারে, সেজন্য তারা ক্যাম্পগুলোকে লক্ষ্য করে ভারী মেশিনগান ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে চতুর্দিক থেকে ব্রাশফায়ার শুরু করে। ক্যাম্পের বিডিআর সদস্যগণ আকস্মিক এই হামলার মুখেও নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালান।
আজও বিচারের অপেক্ষায় খাগড়াছড়ির তাইন্দং, কুমিল্লাটিলা, শুকনাছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা। দীর্ঘ চার দশক পেরিয়ে গেলেও নিহতদের স্বজন এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো আজও সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন এবং এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। গণহত্যার স্বীকার পরিবার গুলোর আক্ষেপ, গণহত্যার নির্দেশদাতা জেএসএস নেতা সন্ত লারমার বিচারের বদলে উল্টো তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বানিয়ে রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমান সরকার প্রধান জনাব তারেক জিয়া এই খুনির বিচার করবেন এবং পিসিজেএসএস, ইউপিডিএফ, কেএনএফ সহ পাহাড়ের সকল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে চিরতরে নির্মূল করবেন।
লেখায়- তানভির হোসেন ইমন। (বান্দরবান)





