পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। কিন্তু এই পাহাড়ের শান্ত বুক চিরে বারবার রক্ত ঝরছে। সেই রক্তের দাগ মুছতে না মুছতেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শুরু হয়েছে এক পরিকল্পিত মিথ্যাচারের মহোৎসব। সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের (UNPFII) ২৫তম অধিবেশনে পিসিজেএসএস-এর প্রতিনিধি অগাস্টিনা চাকমা যে বক্তব্য প্রদান করেছেন, তা কেবল বানোয়াটই নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূল চেতনার পরিপন্থী। প্রবাসী জীবন যাপন করে, পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আকণ্ঠ ডুবে থেকে অগাস্টিনা চাকমা যখন পাহাড়ের ‘সংস্কৃতি’ আর ‘অধিকার’ নিয়ে মায়াকান্না কাঁদেন, তখন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সত্যটা জনসমক্ষে আনা একান্ত প্রয়োজন।
অগাস্টিনা চাকমা জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমার নাতনি এবং প্রীতিবিন্দু চাকমার কন্যা। বর্তমানে তিনি কানাডার প্রবাসী এবং সেখানে নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায়। মজার বিষয় হলো, যিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাহাড়ি নারীদের স্বকীয়তা ও সংস্কৃতির ঝাণ্ডা উড়িয়েছেন, তার ব্যক্তিগত জীবন ও জীবনাচরণ পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩টি জাতিসত্তার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
২০২৩ সাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভাইরাল হওয়া ছবিগুলো সাক্ষ্য দেয়, পশ্চিমা উগ্র জীবনযাপন, খোলামেলা পোশাক এবং মদ্যপ অবস্থায় বিদেশী পুরুষদের সাথে সখ্যতা তার নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। যে উপজাতি নারীরা পাহাড়ে কঠোর পরিশ্রম করে অত্যন্ত শালীন জীবন যাপন করেন, তাদের প্রতিনিধি হিসেবে অগাস্টিনা চাকমার মতো একজন বিজাতীয় সংস্কৃতির ধারককে কোনোভাবেই গ্রহণ করা যায় না। এটি পাহাড়ের নিরীহ জুম্মা জনগণের সরলতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সিম্প্যাথি আদায়ের একটি নোংরা কূটকৌশল মাত্র।
অগাস্টিনা চাকমা তার বক্তব্যে বলেছেন, “জুম্মা নারী ও শিশুরা প্রতিদিন অনিশ্চয়তা নিয়ে জেগে ওঠে যে তারা পরবর্তী হামলা থেকে বেঁচে থাকতে পারবে কি না।”
তার এই বক্তব্যে একটি সত্য আছে, তবে তা তিনি যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তার উল্টো। পাহাড়ের নারীরা সত্যিই আজ অনিরাপদ, তবে তা রাষ্ট্র বা নিরাপত্তা বাহিনীর কারণে নয়; বরং তার নানা সন্তু লারমার হাতে গড়া জেএসএস (মূল) এবং এর সমমনা সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কারণে। পাহাড়ে চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং খুনের প্রধান কারিগর এই জেএসএস।
তথ্যসূত্র ও প্রমাণ:
হিমাগ্রী পাড়া হত্যাকাণ্ড: ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি বান্দরবানের রুমা সীমান্তে জেএসএস সন্তু লারমার সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন উমেপ্রু মারমা (৩৪), যিনি ১৮ জানুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
আয়না চাকমা ধর্ষণ: বিলাইছড়িতে আয়না চাকমাকে পিসিজেএসএস-এর ছাত্র সংগঠন পিসিপি’র ১৫-২০ জন সন্ত্রাসী গণধর্ষণ করে মুমূর্ষু করেছিল শুধুমাত্র বাঙালির সাথে সম্পর্ক রাখার ‘অপরাধে’।
আজ প্রশ্ন জাগে, অগাস্টিনা চাকমা কি এই নারীদের কথা বলতে ভুলে গেছেন? তার নিজের দলের সন্ত্রাসীদের গুলিতে যখন উপজাতি নারীরা বিধবা হয়, তখন কেন জাতিসংঘে তার আওয়াজ শোনা যায় না?
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও স্ব-নিয়ন্ত্রণ: বাধার বিন্ধ্যাচল জেএসএস নিজেই
অগাস্টিনা অভিযোগ করেছেন, ১৯৯৭ সালের চুক্তি ভেঙে পড়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো, সরকার চুক্তির শর্তানুসারে পর্যায়ক্রমে সব পদক্ষেপ নিলেও জেএসএস আজও তাদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র জমা দেয়নি। তারা নামমাত্র কিছু মরিচা ধরা পুরোনো অস্ত্র জমা দিয়ে ভারী অস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে সন্তু লারমার দখলে। সেখানে পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচনের বিধান থাকলেও সন্তু লারমা ১৯৯৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত উপমন্ত্রী পদমর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় সকল সুবিধা ভোগ করে আসছেন। তবুও তারা অভিযোগ করেন বঞ্চনার! প্রকৃতপক্ষে, জেএসএস চায় না চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হোক। কারণ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এবং সেনাবাহিনী প্রত্যাহার হলে পাহাড়ে তাদের সশস্ত্র চাঁদাবাজি ও একাধিপত্যের রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
মিথ্যা ধর্ষণের নাটক ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির চক্রান্ত: অগাস্টিনা চাকমা ২০২৫ সালের ঘটনার বরাত দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছেন। বিশেষ করে খাগড়াছড়ির ১২ বছরের এক কিশোরীর গণধর্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন।
আসল সত্য: খাগড়াছড়ি সিঙ্গিনালার সেই কথিত ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক হিন্দু যুবককে নিরাপত্তা বাহিনী তাৎক্ষণিক আটক করে। কিন্তু পরবর্তীতে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রীর মেডিকেল রিপোর্টে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এটি ছিল একটি সাজানো নাটক, যার নেপথ্যে ছিল ইউপিডিএফ ও পিসিজেএসএস-এর মদদপুষ্ট কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়িতে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিল, তাতে পাহাড়ি-বাঙালি উভয়ের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
একইভাবে বান্দরবান থানচিতে ৫ মে ২০২৫ তারিখে এক খিয়াং গৃহবধূকে বাঙালি শ্রমিকদের ধর্ষণের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাও ছিল বানোয়াট। মূলত জেএসএস এই নারীকে হত্যা করে বাঙালিদের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছিল যাতে সীমান্ত সড়কের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সীমান্ত সড়ক নির্মিত হলে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সংগ্রহ এবং পালানোর পথ বন্ধ হয়ে যাবে, তাই তারা উন্নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপকে নস্যাৎ করতে ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
উন্নয়ন বনাম আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র:
পাহাড়ে সেনাবাহিনী ও বাঙালি বসতি থাকলে জেএসএস-এর ‘জুম্মাল্যান্ড’ নামক পৃথক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। তাই তারা জাতিসংঘে গিয়ে লবিং করছে যাতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বা এনজিওর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত অনেক এনজিও উন্নয়নের আড়ালে দরিদ্র উপজাতিদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করছে এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছে। রাষ্ট্র যেখানে উপজাতিদের জন্য কোটা সুবিধা, উচ্চশিক্ষা ও চাকরিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, সেখানে অগাস্টিনা চাকমারা এসব সুবিধা ভোগ করেও বিদেশের মাটিতে দেশের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছেন।
অগাস্টিনা চাকমা যে ৫টি সুপারিশ জাতিসংঘে দিয়েছেন, তার মূল উদ্দেশ্য হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে সন্ত্রাসীদের রাজত্ব কায়েম করা।
জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীগুলোর দাবি:
১. অগাস্টিনা চাকমা, প্রীতিবিন্দু চাকমা এবং যারা বিদেশের মাটিতে দেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তব্য দিচ্ছে, তাদের পাসপোর্ট বাতিল করে বাংলাদেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হোক এবং এরজন্য জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
২. পার্বত্য চট্টগ্রামে জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর সকল সশস্ত্র আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হোক।
৩. পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী সকল সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সমর্পণ নিশ্চিত করতে হবে এবং আঞ্চলিক পরিষদে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শ্বেতপত্র প্রকাশ করে অগাস্টিনা চাকমার মতো লবিস্টদের মিথ্যাচার প্রমাণ করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, পাহাড়ে শান্তি কেবল চুক্তির কালিতে আসে না, আসে দেশপ্রেম আর অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধের মাধ্যমে। অগাস্টিনা চাকমারা বিদেশের সুরম্য অট্টালিকায় বসে পাহাড়ের রক্ত নিয়ে যে হোলি খেলছেন, তার অবসান হওয়া জরুরি। পাহাড়ের মানুষ এখন উন্নয়ন চায়, শান্তি চায়, অস্ত্র আর লাশের রাজনীতি নয়।
- জাতিসংঘে অগাস্টিনা চাকমার মিথ্যাচার | ছবি সংগৃহীত




