যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও আজারবাইজান:

সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানার ১২ হাজার কোটি টাকা পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য!

Picture of নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

পরিবেশ রক্ষার স্লোগান, আইনি লড়াইয়ের খ্যাতি এবং সুশীল সমাজের আইকন—এই সবকিছুই কি তবে ছিল ক্ষমতা দখলের সিঁড়ি এবং মহাদুর্নীতির একটি নিখুঁত ‘ক্যামোফ্লেজ’ বা ছদ্মবেশ? সদ্য বিদায়ি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া অভিযোগগুলো বিশ্লেষণ করলে এমন ভয়ংকর সমীকরণই সামনে আসে। শুধু রিজওয়ানা হাসানই নন, বিদায়ি সরকারের দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে দুদকে রেকর্ডসংখ্যক দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে।

দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো কেবল সাধারণ দুর্নীতির গল্প নয়; বরং এটি রাষ্ট্রযন্ত্র, কূটনৈতিক প্রটোকল এবং পুরনো রাজনৈতিক সিন্ডিকেটকে ব্যবহার করে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা পাচারের এক সুপরিকল্পিত ‘ক্রস-বর্ডার মানি লন্ডারিং’ বা আন্তঃদেশীয় অর্থ পাচারের ব্লু-প্রিন্ট।

এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং গা শিউরে ওঠা দিকটি হলো—বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সুবিধাভোগীদের সঙ্গে নতুন সংস্কারকদের গোপন অর্থনৈতিক আঁতাত। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর যখন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতির বিচার চাওয়া হচ্ছিল, তখন নেপথ্যে চলছিল অন্য খেলা। দুদকে জমা পড়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী অত্যন্ত গোপনে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের ‘কাস্টোডিয়ান’ বা পাহারাদার হিসেবে কাজ শুরু করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও দুর্নীতিবাজ অভিজাত শ্রেণির (Elites) মধ্যে অর্থের বিনিময়ে একটি অদৃশ্য সমঝোতা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এই চুক্তির অংশ হিসেবেই নসরুল হামিদের ওই সম্পদ বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং নিরাপদ রুট ব্যবহার করে ৪ হাজার কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়।

তিন দেশে অর্থ পাচারের ভৌগোলিক বিস্তৃতি

রিজওয়ানা হাসানের অর্থ পাচারের রুট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন দেশের ইকোনমিক জোনকে বেছে নিয়েছেন:

১. যুক্তরাষ্ট্র (মেগা লন্ডারিং): নসরুল হামিদের সম্পদের ৪ হাজার কোটি টাকার পাশাপাশি, রিজওয়ানা হাসান নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে আরও প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। হুন্ডি, ওভার-ইনভয়েসিং এবং শেল কোম্পানির (ভুয়া কোম্পানি) মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ ডলার পাচার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান।

২. দুবাই (পারিবারিক নেটওয়ার্ক): অর্থ পাচারের অন্যতম নিরাপদ স্বর্গরাজ্য দুবাইকে তিনি ব্যবহার করেছেন তার আপন বোনের মাধ্যমে। বোনের নামে রাতারাতি খোলা বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেশ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে বিনিয়োগ করা হয়েছে। পারিবারিক সদস্যকে ব্যবহার করা মানি লন্ডারিংয়ের একটি ক্লাসিক মেথড, যাতে নিজের নাম সরাসরি সামনে না আসে।

৩. আজারবাইজান (কূটনৈতিক প্রটোকলের অপব্যবহার): দুর্নীতির ইতিহাসে সবচেয়ে অভিনব ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের নভেম্বরে। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (COP29) তিনি যান বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে। রাষ্ট্রীয় খরচে এবং ভিআইপি প্রটোকল নিয়ে তিনি জলবায়ু রক্ষার কথা বলতে গিয়ে বাস্তবে নিজের আখের গুছিয়েছেন। কূটনৈতিক সুবিধার (Diplomatic immunity) আড়ালে তিনি বাকুতে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেন এবং সেখানে থাকা তার আত্মীয়-স্বজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন।

পরিবেশ রক্ষার নামে ‘শ্যাডো স্টেট’ ও ১০০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ

দুদকে জমা পড়া আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে একটি হলো—পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ[2]। ইসিএ (Ecologically Critical Area) ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু তহবিলের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের বাজেটকে সুকৌশলে ওভার-ইনভয়েসিং (অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো) ও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, ‘পরিবেশ রক্ষা’র আইনি ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জমি অবৈধভাবে দখলের যে অভিযোগ উঠেছে, তা প্রমাণ করে ক্ষমতা হাতে পেয়ে তিনি রীতিমতো একটি ‘শ্যাডো স্টেট’ বা ছায়ামুক্তারিতে পরিণত হয়েছিলেন।

সিস্টেমিক লুটপাট: কাঠগড়ায় পুরো মন্ত্রিসভা

দুদকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান একাই নন, পুরো অন্তর্বর্তী সরকারই যেন দুর্নীতির এক মহোৎসবে মেতেছিল:

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: খোদ সাবেক সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে গ্রামীণ টেলিকম ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনা, আয়কর ফাঁকি, ট্রাস্টের নামে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে।

আসিফ নজরুল: সাবেক আইন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ১৮ মাসে টাকার বিনিময়ে বহু জামিন বাণিজ্য (যার মধ্যে গায়ক তাপসের জামিন অন্যতম), বিচারক পদায়নে অনিয়ম এবং সাব-রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে।

আসিফ মাহমুদ: সাবেক যুব ও শ্রম উপদেষ্টার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ গ্রহণ এবং ‘বিটকয়েন’ (ক্রিপ্টোকারেন্সি) ব্যবহারের মাধ্যমে বিদেশে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে।

অন্যান্য উপদেষ্টা: সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিরুদ্ধে সামিট গ্রুপসহ বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে আর্থিক অনিয়ম, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি ও কেনাকাটায় অনিয়ম এবং তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে বড় অঙ্কের দুর্নীতির অভিযোগ পুরো সরকারের নৈতিক স্খলনের চিত্রই তুলে ধরে।

এই নজিরবিহীন দুর্নীতির বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। প্রাথমিক দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেলে এবং তা আমলযোগ্য হলে অবশ্যই স্বাধীন তদন্ত হতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পেলে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তবে একইসঙ্গে যেন কেউ হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।”

তার এই বক্তব্যের বিশ্লেষণাত্মক অর্থ হলো, ‘অধিকারকর্মী’ বা ‘সুশীল সমাজ’ থেকে আসা ব্যক্তিরা যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান, তখন তাদের ওপর নজরদারির কোনো বিকল্প ব্যবস্থা (Checks and balances) ছিল না। এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই তারা দুর্নীতি করেছেন।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা এই ১২ হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতির অভিযোগ বাংলাদেশের ইতিহাসে আস্থার সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে। যারা রাষ্ট্র মেরামতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তারাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছেন। দুদক বর্তমানে এই শত শত অভিযোগের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিশাল অঙ্কের পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং এই ‘সাদা কলার’ (White-collar) অপরাধীদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন নতুন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

  • যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও আজারবাইজান:

About The Author

সিংড়ায় সেচ কাজে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে তরুণ কৃষকের প্রাণহানি

নাটোরের সিংড়া উপজেলায় কৃষি জমিতে পানি সেচের সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সজল (২৪) নামে এক তরুণ কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে

Read More »

সিলেটে আইনি সহায়তায় প্রস্তুত অ্যাডভোকেট আমরুল কায়েস চৌধুরী

সিলেটে আইনি সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত রয়েছেন অ্যাডভোকেট আমরুল কায়েস চৌধুরী। তিনি সিলেট দায়রা ও জজ কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন বলে জানা গেছে। জানা যায়,

Read More »

চাঁপাইনবাবগঞ্জে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬ উপলক্ষে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভা

আসন্ন হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬ সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ

Read More »

ময়মনসিংহে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত, সমন্বয় সভায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

ময়মনসিংহ জেলায় এপ্রিল ২০২৬-এর মাসিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার (১৯ এপ্রিল) সকালে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ সভা

Read More »

মধুপুর শালবন রক্ষায় মানববন্ধন, বন ধ্বংস বন্ধের জোর দাবি

বাংলাদেশের গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলায় বিস্তৃত ভাওয়ালের গড় ও মধুপুরের গড়ের শালবন আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অসাধু দখলবাজ ও কিছু বন কর্মকর্তার

Read More »

সোনামসজিদ সীমান্তে ৫৯ বিজিবির বড় সাফল্য, ভারতীয় ট্রাকসহ প্রায় ৬ হাজার বোতল মাদক সিরাপ জব্দ

সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালানবিরোধী জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি)। শিবগঞ্জ উপজেলার সোনামসজিদ সীমান্ত এলাকায় বিশেষ

Read More »

Table of Contents